- এই মুহূর্তে ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
- সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৫
পুরুলিয়ার অনুপর্ণার ভেনিস জয়! ‘ভুলে যাওয়া গাছেদের গান’ ছবির জন্য সেরা পরিচালকের খেতাব
রূপোলি পর্দার আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় আবারও ভারতের জয়জয়কার। আর সে জয়ের আলোককেন্দ্রে এক বাঙালি মেয়ে—পুরুলিয়ার অনুপর্ণা রায়। ৮২তম ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ‘অরিজ়োন্তি’ বিভাগে সেরা পরিচালকের সম্মানে সম্মানিত হলেন তিনি। তাঁর পরিচালিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি ‘Songs of Forgotten Trees’ (ভুলে যাওয়া গাছেদের গান) তাঁকে এনে দিল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। এই প্রথম কোনো ভারতীয় পরিচালক ওই বিভাগে সেরা পরিচালক সম্মানে সম্মানিত হলেন। পুরুলিয়ার নারায়ণপুরের মেয়ে অনুপর্ণার বিজয় নিয়ে এখন উত্তাল তাঁর পরিবার থেকে শুরু করে গোটা জেলা, রাজ্য এবং দেশ।
নারায়ণপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পড়াশোনার শুরু অনুপর্ণার। এরপর রানীপুর কোলিয়ারি হাই স্কুল ও নওপাড়া হাই স্কুল হয়ে কুলটি কলেজে ইংরেজি অনার্স। পরে দিল্লিতে মাস কমিউনিকেশন নিয়ে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা। কোনো ফিল্ম স্কুল নয়, রেড কার্পেট নয়—সোজা গল্প বলা আর সাহস নিয়ে তাঁর দুর্দম এগিয়ে যাওয়া। জীবনের প্রথম ভাগে পা রাখেন কর্পোরেট জগতে। দিল্লিতে একটি বহুজাতিক তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থায় কাজ করতেন। মাইনে ভালো, জীবন নিশ্চিন্ত। কিন্তু মনের মধ্যে যে গল্পেরা নাড়াচাড়া করত, তাদের হাতছানি ভোলা যায়নি। কোভিড-পরবর্তী সময়ে হঠাৎ করেই সবকিছু ছেড়ে মুম্বই চলে আসেন অনুপর্ণা। ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যেই শুরু হয় চিত্রনাট্যের কাজ।
View this post on Instagram
‘Songs of Forgotten Trees’ ছবিটির শ্যুটিং হয়েছে অনুপর্ণার আজাদ নগরের ছোট্ট ভাড়াবাড়িতে। ৩ মাস ধরে দুই মুখ্য অভিনেত্রী নাজ শেখ ও সুমি বাঘেল সে ফ্ল্যাটেই থেকেছেন। রান্না হয়েছে, ঝগড়া হয়েছে, আবার ক্যামেরাও ঘুরেছে। কোনো বড়ো প্রযোজক, স্টার বা ঝলমলে সেট নয়— শুধুই গল্প আর নির্মাতার অকল্পনীয় জেদ। ছবিটির প্রযোজক বিবংশু রাই, রোমিল মোদী ও রঞ্জন সিংহ। আর ছবি উপস্থাপনায় ছিলেন পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপ। মুম্বই শহরের প্রান্তিক ২ অভিবাসী নারীর চোখ দিয়ে সমাজকে দেখা, নিঃসঙ্গতা, চুপচাপ লড়াই আর অস্তিত্বের খোঁজ—এইসব নিয়ে ছবির কাহিনি। সমালোচকেরা ছবিটিকে বলেছেন ‘আবেগঘন’ আবার একই সাথে নতুন চিন্তার খোরাক দেওয়া মাস্টারপিস। ভারত থেকে একমাত্র এই ছবিই গিয়েছিল এন্ট্রি ‘অরিজ়োন্তি’ বিভাগে। ভেনিসের মঞ্চে যখন ফরাসি পরিচালক জুলিয়া ডুকর্ণো অনুপর্ণার নাম ঘোষণা করেন, তখন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন অনুপর্ণা নিজেই। পরে বলেন, ‘এ যেন অকল্পনীয় স্বপ্ন।’
পুরস্কার গ্রহণের মঞ্চে কেবল সিনেমা নয়, রাজনীতি এবং মানবিকতার স্বরও শোনা গেল অনুপর্ণার কণ্ঠে। তিনি বলেন, ‘প্যালেস্টাইনেও শিশুদের শান্তির অধিকার থাকা উচিত। এ মুহূর্তে, আমাদের দায়িত্ব নিজেদের সীমার বাইরে গিয়ে ভাবার। আমি জানি এতে আমার দেশ রাগ করতে পারে, কিন্তু তাতে আমার কিছু আসে যায় না।’ এর পর কৃতজ্ঞতা জানান প্রযোজক, কলাকুশলী, এবং তাঁর গ্রামের মানুষজনকে। তিনি বলেন, ‘এই পুরস্কার আমার নয়, এটা আমাদের। কুলটি, নারায়ণপুর, রাঙ্গামাটির প্রত্যেকটি মানুষকে আমি উৎসর্গ করছি এই সম্মান।’ অনুপর্ণার বাবা ব্রহ্মানন্দ রায়, ইস্টার্ন কোলফিল্ডস লিমিটেডে কর্মরত, সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম মেয়ে সরকারি চাকরি করবে। কখনো ভাবিনি ও সিনেমার দুনিয়ায় যাবে। এখন তো শুধু গর্বে বুক ভরে যাচ্ছে।’ মা মানীষা রায় বলেন, ‘ও বাড়ি ফিরলে ওর প্রিয় সব রান্না করব। ওর মুখের হাসিটাই আমাদের সবচেয়ে বড়ো পুরস্কার।’
View this post on Instagram
বঙ্গতনয়ার অসামান্য কৃতিত্বে উচ্ছ্বসিত মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি লিখেছেন, ‘পুরুলিয়ার মেয়ে অনুপর্ণা রায় আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলার মুখ উজ্জ্বল করেছে। ওর এই অর্জন জঙ্গলমহল-এর প্রত্যন্ত গ্রামের প্রতিটি মেয়ের জয়ের প্রতীক।’ তিনি আরো লিখেছেন, ‘আমি তাঁর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি। বাংলা এক দিন বিশ্ব চলচ্চিত্রের মানচিত্রে আবার অন্যতম সেরার আসন পাবে, আজ অনুপর্ণা সে পথ তৈরি করে দিল।’
এ বছরে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের সেরা ছবির পুরস্কার পেয়েছে আমেরিকান স্বাধীন চলচ্চিত্র ‘Father Mother Sister Brother’। সেরা পরিচালকের পুরস্কার পেয়েছেন বেনি সাফদি, তাঁর ছবি ‘The Smashing Machine’-এর জন্য। ভেনিসের ঝলমলে সন্ধ্যায় বেবাক উচ্চারণে আর শৈল্পিক নির্মাণের দক্ষতায় ভারতের আলো জ্বালিয়ে রাখলেন অনুপর্ণা রায়। আর সে আলো শুধু রুপালি পর্দা নয়, ভেনিসে নয়, বাংলা তথা ভারতের হাজার হাজার প্রান্তিক গ্রাম, মফসসল, ছোটো শহরের লাখো লাখো মেয়েকে স্বপ্ন দেখার আলোকবর্তীকা হয়ে উঠল ।
❤ Support Us







