Advertisement
  • এই মুহূর্তে ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
  • এপ্রিল ২৯, ২০২৫

হায়দারের ‘রুহ্-দার’, মকবুলের চোখ– ইরফানের সীমান্তহীন সাম্রাজ্য

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
হায়দারের ‘রুহ্-দার’, মকবুলের চোখ– ইরফানের সীমান্তহীন সাম্রাজ্য

ধু ধু করছে বরফ আর উপত্যকায় নামছে কুয়াশার অন্ধকার। কিছুটা পা টেনে টেনে এগিয়ে আসছেন একজন। দীর্ঘ গড়ন, গায়ে চাদর, চোখে কালো চশমা; তাতে গুঁড়ো গুঁড়ো বরফ জমেছে। হাত দিয়ে মুঝে দিলেন অন্ধকার, বেড়িয়ে এল আলো, চোখের আলো। ‘I am thy father’s spirit, Doom’d for a certain term to walk the night…’– উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ‘হ্যামলেট’-এর কিংবদন্তি সংলাপ ভারতীয় প্রেক্ষাপটে এক গভীর বাস্তবতায় পরিণত হয়েছিল বিশাল ভরদ্বাজ পরিচালিত ২০১৪ সালের চলচ্চিত্র হায়দার-এ। সেখানে মৃত পিতার বিদেহী আত্মা আর শুধু গথিক ফ্যান্টাসি নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের রুহ্, বাস্তব। ছোট্ট কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকায় ইরফান খান নিজেকে আবারো চিনিয়ে দিয়েছিলেন নিজের দক্ষতা। …অভিনয়ে অভিব্যক্তিও সমান তাৎপর্যময়। এই ছিল ইরফান খানের অভিনয়শৈলীর মূল মন্ত্র। তিনি জানতেন কখন চুপ থাকতে হয়, কখন সউল্লাসে, হাসি আর বাকময়তায় মাতিয়ে দিতে হয়, কখনই বা শুধু চোখের ভাষায় বা দেহভঙ্গিতে সংলাপ ছাড়াও চরিত্রের গভীরতা ফুটিয়ে তোলা যায়। তাঁর অভিব্যক্তিতে ছিল এক অব্যক্ত কাব্যিকতা, যা অনেক সময় সংলাপের চেয়ে বেশি অর্থবহ হয়ে দাঁড়ায়।

বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ‘ম্যাকবেথ’ ট্র্যাজেডির শিকড়। এই নাটকের রক্তস্নাত ক্ষমতালিপ্সা, প্রেম ও আত্মসংঘাতের কাহিনি আধুনিক চলচ্চিত্র নির্মাতাদের বারবার আকৃষ্ট করেছে। ২০০৪ সালে বিশাল ভরদ্বাজ নির্মাণ করেন ‘মকবুল’। ম্যাকবেথ-এর ন্যারেটিভকে নিয়ে গিয়ে ফেললেন মুম্বাইয়ের অপরাধ জগতে। এই ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘মকবুল’-এর ভূমিকায় অভিনয় করলেন ইরফান খান। শোফায় আধশোয়া ইরফান, ঘুরে তাকাচ্ছেন, তাঁর চোখ শূন্যতার সীমান্তহীন সাম্রাজ্য দেখছে, আর আমরা দেখছি, হিন্দি সিনেমা জগতের এক অনন্য বিস্ময়, এক ভারতবর্ষকে। জটিল, দ্বন্দ্বময় চরিত্রের গভীর মনস্তাত্ত্বিক রূপের ব্যঞ্জনা, তিনি শুধু এক গুন্ডা বা খলনায়ক নন—তিনি একজন প্রেমিক, একজন পুত্রসম অনুগত সাথী, আবার একই সঙ্গে এক ক্ষমতালোভী খুনি। তাঁর চোখ, মুখ, কণ্ঠ আর শরীর— ঠিক যেন বিষ্ফোরণের আগের সুপ্ত আগ্নেয়গিরি। মকবুল-এর চরিত্রে তাঁর অভিনয় এতটাই অনবদ্য ছিল যে, সমালোচকরা বলতে বাধ্য হন: শেক্সপিয়রের ম্যাকবেথ সম্ভবত এত জীবন্তভাবে কেউ ফুটিয়ে তুলতে পারেন নি। এ ছবিতে ইরফানের সঙ্গে তাব্বুর অভিনয়ও ছিল বিস্ময়কর। লেডি ম্যাকবেথের ভারতীয় রূপে তাব্বুর ‘নিম্মি’ চরিত্র, মকবুলের মতোই শক্তিশালী ও ধ্বংসাত্মক। নৈঃশব্দ্যে গড়ে ওঠা প্রেম, পরস্পরের প্রতি আনুগত্য আর সন্দেহ তাবু কীভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন জানি না।

এই কারণেই ইরফান খানকে শুধু অভিনেতা হিসেবে বিচার করা যায় না, তিনি হয়ে উঠেছিলেন ভারতীয় এবং আন্তর্জাতিক সিনেমা-ভাষার এক স্বতন্ত্র ব্যাকরণ। তাঁর মতো করে চরিত্রে ঢুকে পড়া, তাকে জটিল না করে স্বাভাবিকভাবে তুলে ধরা, এবং প্রয়োজনীয় সংবেদনশীলতা নিয়ে তা দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়া—এই সবকিছু মিলিয়ে ইরফান ছিলেন এক অভিনয়প্রতিভার প্রতীক। তিনি প্রমাণ করে গেছেন, গ্ল্যামারের মোড়ক ছাড়াও সিনেমা হতে পারে আবেগ, সংবেদন এবং উপলব্ধির এক অসাধারণ প্ল্যাটফর্ম—যেখানে একজন রুক্ষ বাস্তবতার মানুষও হয়ে উঠতে পারেন গল্পের নায়ক। যেখানে মুখ্য চরিত্র না হয়েও, একজন অভিনেতা পর্দায় রেখে যেতে পারেন চিরস্থায়ী ছাপ।ইরফান খান ছিলেন ঠিক এমনই একজন শিল্পী, যাঁর উপস্থিতি সিনেমার দৃশ্যতাত্ত্বিক পরিসরকে এক অনন্য স্তরে উন্নীত করত। তিনি ছিলেন সিনেমা-নির্ভর, সংলাপ-নির্ভর নয়। তাঁর অন্তরের অভিনয় দর্শকের হৃদয়ে তৈরি করে দিত এক শব্দাতীত প্রতিধ্বনি।

ইরফান খানের পথচলা শুরু হয়েছিল প্রতিকূলতা, আর্থিক সঙ্কট আর পারিবারিক সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে। রাজস্থানের টঙ্ক জেলার খাজুরিয়া গ্রামের এক সাধারণ ব্যবসায়ী পরিবারে জন্মগ্রহণকারী সাহাবজাদে ইরফান আলি খান, জয়পুর থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর ১৯৮৪ সালে দিল্লির জাতীয় নাট্যবিদ্যালয়ে বা এনএসডি-তে ভর্তি হন। সেই সময়ে ইব্রাহিম আলকাজির মতো বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তির সান্নিধ্যে ইরফানের অভিনয়শিল্পের ভিত্তি রচিত হয়। অভিনয় নিয়ে তাঁর নিষ্ঠা আর শ্রমের কাহিনী আজ ভারতীয় অভিনয়চর্চার এক কিংবদন্তি অধ্যায়। প্রথম জীবনে পেশাদার নাট্যাভিনয়ের পাশাপাশি তিনি কিছুদিন এসি মেকানিক হিসেবেও কাজ করেছিলেন, এমনকি একবার সুপারস্টার রাজেশ খান্নার বাড়িতে এসি সারাতেও গিয়েছিলেন। এমন অভিজ্ঞতাগুলিই তাঁর শিল্পীসত্তাকে আরো শক্তিশালী, আরো গভীরতর করে তুলেছিল। ১৯৮৮ সালে মীরা নায়ারের ‘সালাম বোম্বে’-তে একটা ছোট চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে রুপালি পর্দায় যাত্রা শুরু হয় তাঁর, কিন্তু তাৎক্ষণিক সাফল্য তখনও আসেনি। একের পর এক ছোটপর্দার নানা চরিত্রে তিনি ধীরে ধীরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে থাকেন—‘লাল ঘাস পে নীল ঘোড়া’, ‘কিরদার’, ‘ভারত এক খোঁজ’, ‘চাণক্য’, ‘দ্য গ্রেট মারাঠা’-র মতো ধারাবাহিকে তাঁর অভিনয় নজর কাড়ে। তপন সিংহের ‘এক ডক্টর কি মৌত’ তাঁর অভিনয় জীবনে এক নতুন বাঁক নিয়ে আসে। সাংবাদিকের চরিত্রে তাঁর অনবদ্য আন্তর্জাতিকভাবে তাঁকে কিছুটা পরিচিত করে তোলে। এরপর ২০০৩ সালে ‘রোগ’ ছবিতে প্রথমবার মুখ্য চরিত্রে, আর ২০০৪ সালে বিশাল ভরদ্বাজের ‘মকবুল’-এ তাঁর অভিনয় ইরফানকে পরিণত করে এক কালজয়ী অভিনেতায়। এ পর আর ফিরে তাকাতে হয় নি তাঁকে, একে একে ‘নেমসে’ (২০০৬), ‘লাইফ ইন আ মেট্রো’ (২০০৭), ‘পান সিং তোমার’ (২০১১), ‘দ্য লাঞ্চবক্স’ (২০১৩), ‘হায়দার’ (২০১৪), ‘মাদারি’ (২০১৬), ‘হিন্দি মিডিয়ম’ (২০১৭)—প্রতিটি ছবিতে ইরফান নিজেকে শুধু অভিনেতা হিসেবে নয়, বরং মানব-অভিজ্ঞতার গল্পকার হিসাবেই নিজের ‘খেল’ দেখালেন। ‘হিন্দি মিডিয়ম’ তাঁকে এনে দেয় শ্রেষ্ঠ অভিনেতার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার।

তবে ইরফানের সাম্রাজ্যকে কী হিন্দি সিনেমার গণ্ডিতে আটকে রাখা যায়! ‘লাইফ অফ পাই'(২০১২), ‘দ্য অ্যামেইজিং স্পাইডার-ম্যান’ (২০১২), ‘জুরাসিক ওয়ার্ল্ড'(২০১৫), ‘ইনফার্নো’ (২০১৬)-র মতো বিখ্যাত ছবিতে পার্শ্বচরিত্র হলেও তাঁর অনবদ্য উপস্থিতি চোখ এড়ায়নি দর্শকের। পিটার ব্র্যাডশের মতো আন্তর্জাতিক সমালোচক তাঁকে দক্ষিণ এশিয়া এবং হলিউডের মধ্যে এক শিল্পিত সেতুবন্ধনের প্রতীক বলে উল্লেখ করেছিলেন। লাইফ অফ পাই- এ তাঁর উক্তি, ‘শেষমেশ সবকিছু ছেড়ে দেবার নামই জীবন’ আজো ঘুরে বেড়ায় সোশ্যাল দুনিয়ার আনাচে কানাচে। তাঁর কণ্ঠদানে বাচ্চারা মুগ্ধ হয়েছিল ‘দ্য জাঙ্গল বুক’-এর ‘বাল্লু’ চরিত্রে। আর বড়দের চোখে তিনি ছিলেন একমাত্র অভিনেতা, যিনি চেহারা, গ্ল্যামার নয়, চরিত্রের গভীরতা দিয়েই জায়গা করে নিতে পেরেছিলেন তাঁদের হৃদয়ের ওয়াইড স্ক্রিনে।

২০১৮ সালে তাঁর মস্তিষ্কে নিউরো-এন্ডোক্রিন টিউমার ধরা পড়ে। ইংল্যান্ডে দীর্ঘ চিকিৎসার পর তিনি ফিরে আসেন এবং ‘আংরেজি মিডিয়ম’ ছবিতে শেষবারের মতো দর্শকদের সামনে হাজির হন। কিন্তু, ভাগ্য আর সুযোগ দেয়নি। ২০২০ সালের ২৯ এপ্রিল, মাত্র ৫৩ বছর বয়সে, ইরফান খান আমাদের ছেড়ে চলে যান। ইরফানের চলে যাওয়া ফিল্ম দুনিয়ায় যে শূন্যতা তৈরি করেছে তা মেটার নয়। সুজিত সরকার, বিশাল ভরদ্বাজ, টম হাঙ্কস, নাসিরুদ্দিন শাহ, আজও খুঁজে চলেন তাঁদের প্রিয় অভিনেতা, প্রিয় মানুষ ইরফানকে। আজও, যখন আন্তর্জাতিক সিনেমার কোনো চিত্রনাট্যে কোনও ভারতীয় চরিত্র প্রয়োজন হয়, তখন গভীর শোকে প্রথম যে নামটি উচ্চারিত হয়, তা ইরফান খান। তাঁর এই স্বীকৃতি কেবল তাঁর একার নয়—এটি ভারতীয় অভিনয়শিল্পের দীর্ঘ বিবর্তন ও শৈল্পিক পরিণতিরও দলিল। ইরফান খানের চলে যাওয়া শুধু একজন প্রতিভাধর অভিনেতার হারানো নয়, এমন একজন মানুষের চলে যাওয়া, যিনি আমাদের শেখালেন শুধু সিনেমা নয়, জীবনের প্রতিও কত গভীর সংবেদনশীলতা থাকা প্রয়োজন। ভারতের বৈচিত্র্য, রাজনীতি, মানুষ বিবিধতার নিরবিচ্ছন্ন পাঠ আজীবন দিয়ে গেলেন ইরফান, ভারতের ‘রুহ্-দার।’

ইরফান খান আমাদের চোখের সামনে থেকে চলে গেলেও, আমাদের স্মৃতির রুপালি পর্দায়, শিল্পীসত্তার শ্রদ্ধামঞ্চে তিনি চিরকাল অমর। একজন স্ট্যানিস্লাভস্কীয় অভিনেতা, যিনি নিছক সংলাপ নয়, নীরবতা দিয়েও জীবনের গভীরতম অভিব্যক্তিকে ব্যক্ত করতে পারতেন, তাঁর মতো শিল্পী আর আসবেন কি ? হয়তো না। কিন্তু তিনি অনুপ্রেরণা হয়ে থেকে যাবেন, প্রতিটি সেই শিল্পীর মনে, যে সত্যিকারের অভিনয়ের পথ অনুসন্ধান করতে চায়।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!