Advertisement
  • গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
  • জানুয়ারি ৭, ২০২৪

অপাপবিদ্ধ

রণবীর পুরকায়স্থ
অপাপবিদ্ধ

অলঙ্করণ: দেব সরকার

তারা অনেক দিন অভিযোগ করেছে চক্রধরের গাড়ি চালানো নিয়ে। ষাটের উপর ওঠায় না স্পিড। আর রাত হলে তো কথাই নেই, কিছুই দেখে না গতি বাড়াবে কোথায়। মানুষটা রাতকানা। পারলে তারা আরও কিছু দোষ যোগ করতে পারে। বাইরে কোথাও গেলে চক্রধর মদটদ খায়, কিন্তু কখনো মদ খেয়ে গাড়ি চালায় না। তবে মূল অভিযোগের প্রথমটি যে ধোপে টেকে না, দুরন্ত গতিতে গাড়ি চালায় না বলেই তো তাকে রাখা, মূলত তারার সুপারিশেই। আর দ্বিতীয় অভিযোগ নিয়ে তো তারা নিজেই নিশ্চিত নয়, তার ছেলে নকুল মাকে বলেছে। নকুল গাড়িতে বসে বন্ধুদের সঙ্গে মাল খেয়ে বোতল ফেলতে ভুলে গেছে। পরদিন গাড়ির ভিতর থেকে হুইস্কির বোতল দেখিয়েছে চক্রধর। ব্যস, চক্রধরের উপর খার খেয়ে গেছে ছেলে। তাই বাবুর গোঁসা। তবে তারার রাগের স্থায়ীত্ব তাৎক্ষণিক, বলে, 

—একটা ড্রাইভার দেখ এবার। 

আবার চক্রধর না হলে তার চলে না। বউদি কী কী ভালবাসে, কখন কোথায় যেতে পছন্দ করে সব চক্রধরের নখদর্পনে। বরদান মার্কেটে গেলে লিটল রাসেল স্ট্রিটের পাঞ্জাবি ধাবায় গাড়িতে বসে এক কাপ চা আর পদ্ম নিমকি খেয়ে ওয়েটার গোবিন্দকে দু পয়সা বেশি করে টিপস দেওয়ার বিলাসিতা করে মাঝে মাঝে, শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালের পাশের গলিতে গুরুদোয়ারার উলটো দিকে শর্মার দোকান থেকে একই ধরণে চা সিঙাড়া অমৃতির ব্যবস্থা করে চক্রধর। দক্ষিণ কলকাতার মহারাজার গরম কচুরি আর চা খেতে হলে নামতে হয় গাড়ি থেকে, তবে ওখানে দুচারটে বেশি খায় চক্রধর। আর এসএন ব্যানার্জি আর মতি শীলের ক্রসিংয়ে হিংয়ের কচুরি খাওয়া হয় না কাছাকাছি পার্কিং পাওয়া না গেলে। চক্রধর ওদের ছেড়ে গিয়ে আবার এসে নিয়ে গেলেই তো পারে। কিন্তু না, তারার এই উদ্ভট নিয়ম ওরা যা খাবে, যেখানে যাবে চক্রও যাবে এবং খাবে। অহিভূষণের মতে চক্রধর ড্রাইভার হল একটি কমপ্লিট প্যাকেজ। গাড়ি চালানোর সাড়ে বত্রিশ ভাজা। গাড়ির মালিকনিকে সন্তুষ্ট করার কলাকৌশল সে জানে। শহর কলকাতা আর তার আশেপাশের সব মন্দিরের ঠিকানা তার জানা। কলকাতায় নাকি কালি মন্দির সবচেয়ে বেশি, তারপরই জগন্নাথ মন্দির, এখন তো দীঘায় হচ্ছে বৃহত্তম। সব দেখা হয়ে গেছে। তার উপর পাড়ার, রাজ্যের এবং কেন্দ্রের রাজনীতি নিয়ে আপডেট দেওয়ায় চক্রধরের জুড়ি নেই। কোন কালে পাড়ার তৃণমূল নেতা তাকে বিনাকারণে ক্যালিয়েছিল বলে সে এখন মোদিভক্ত হনুমান। বিজেপি কিংবা তৃণমূল নয় বলে তারা চক্রধরের রাজনৈতিক ভাষ্যে উৎসাহ দেয়, শুধু সিপিয়েম নিয়ে কিছু বললেই বলে, ছাড়িয়ে দেবে। তবে চক্রধর মাঝেমাঝে ‘নেই পার্টি’ বলে ফেলে মুখ ফসকে। গাড়ির ড্রাইভারের সঙ্গে এসব বকবকানি অহিভূষণের একেবারেই পছন্দ নয়। বিরক্তি প্রকাশ করলেও তারা কেয়ার করে না। বলে আমার গাড়ি আমি যা ইচ্ছে হয় তাই করব, তুমি বলার কে। তারার যুক্তিগুলি সব দাবা খেলার ঘোড়ার চালের মতো, লাফিয়ে লাফিয়ে যায়। যতদিন চাকরি ছিল ততদিন গাড়ি তার, রিটায়ার করার পর কিছুদিন আমাদের, এখন তো মালিকানা একার। যুক্তি নিয়ে লড়াই করলে জিতবে না জেনে অহিভূষণ মেনে নেয়। যেমন ছেলে নকুলেশ্বরের মালিকানা নিয়েও যৌথ অভিপ্রায় লুপ্ত হয়ে গেছে। তোমার ছেলে আমাদের ছেলে এখন আমার ছেলে। তারা জানে তার ছেলে চেন্নাই থাকলেও দিনে তিনবার ভিডিও কল করবেই করবে। অহিভূষণ এ দানে ইদানীং সে ছেলের বিষয়ে কিছুই জানে না, যেমন নতুন গাড়ির ব্যাপারেও কিছুই জানেনা। অহিভূষণ জানে তার গাড়ির রং গ্রে, কিন্তু সেটা যে কেমন গ্রে, ততটা জানে না। ভিড়ের মধ্যে গাড়ি থাকলে সে অন্য গাড়ির হাতল ধরেও টানাটানি করে। গাড়ির ব্রেক কিংবা ক্লাচে শব্দ হলে তারা ধরতে পারে, কোনদিন গাড়ি ধোয়ানো হয়নি সবজানে। ড্রাইভার চক্রধরের মুখভার থাকলে সে ধরতে পারে, লং ড্রাইভের পথে চা সিঙাড়া খাইয়ে মুড ঠিক করে দেয়। সোনাঝুরির হাট থেকে চক্রধরের স্ত্রীর জন্য শাড়ি কিনে দেয়, বনলক্ষ্মী থেকে ঘি কিনলে চক্রধরকেও দেয় এক কৌটো, নিমপিঠ থেকে নলেন গুড় কিনলে একহাড়ি যায় ড্রাইভার বাড়ি। এসব নিয়ে খুব সুনাম বউদির। চক্রধরের বউ তরঙ্গও খুশি হয়ে হিংয়ের বড়ি বানিয়ে স্যারের জন্য পাঠায়। বৈশাখ মাসে আমের আচারও আসে স্যারের জন্য। তারা অহিভূষণকে বলে, আমি কি হিংয়ের বড়ি খাই না, নাকি আমের আচার তুমি খেয়েছ কোনোদিন? 

একার চোখে জীবন দেখতে ভুলে গেছে অহিভূষণ, সব কিছুতেই তার তারা চাই। সে একা বাড়িতে থাকতেও ভয় পায়, তাই তারা বাপের বাড়ি গেলে সেও সঙ্গে যায় ফ্রি। অহিভূষণের জীবন প্রণালী হাইজ্যাক করে নিয়েছে তারা

— আমি কী করে জানব? 

— বলেছ হয়তো কোনো দিন।

— চিনিই না মহিলাকে। 

— শুনেছি তোমার ড্রাইভারের বউ খুব সুন্দরী। 

—কী আশ্চর্য! 

অহিভূষণ জানে পরিস্থিতি খুব বিপজ্জনক, এসব কথার ফাঁকে ওকে গাড্ডায় ফেলে দেওয়ার প্রচেষ্টা। তারা নিজেও খাবে না অন্যকেও খেতে দেবে না, স্বামীর প্রতি মূলো পটলের মতো ব্যবহার করবে, পাত্তাই দেবে না আর ভিন্ন রমণীর দিকে তাকাতেও দেবে না। প্রসংশা করলে তো দক্ষযজ্ঞ বাঁধিয়ে ফেলবে। তাই অদেখা তরঙ্গকে নিয়ে তারা বিক্তি মেপে। অহিভূষণের স্ত্রীভক্তির মাপ দেখে নেয় ঠিক আছে কিনা। বিয়ের আগে দু একটা ছুটকা ছাটকা প্রেম করলেও, বিয়ের পর তারা ছাড়া গীত নেই অহিজীবনে। যদিও বিয়ের আগের একটা কেস বেশ বেয়াড়া ভাবে নড়াচড়া করেছে কিছুদিন, ধরা পড়তে পড়তে বেঁচে গেছে। এখনও আছে বাবলি মোবাইলে, তারাপ্রসন্ন নামে। তারাপ্রসন্ন এখনও হোয়াটস অ্যাপে গান পাঠায় রোমান্টিক, ফেলে আসা দিনের ছবি পাঠায় একার। অহিভূষণ বোকার মতো কোনো কাজই করেনি প্রমাণ রাখেনি কোথাও, প্রেমিকার সাথে পোজ দিয়ে ছবি ওঠেনি। তবে নতুন করে হারিয়ে যাওয়া ফিরে পেয়ে মন্দ লাগেনি, তারার প্রতিও তার প্রেম কমেনি। তারাই তার জীবনটা পঙ্গু করে দিয়েছে। বিয়ের পর কেমন ভ্যাবলে গেছে। একার চোখে জীবন দেখতে ভুলে গেছে অহিভূষণ, সব কিছুতেই তার তারা চাই। সে নিজে এমন ভিতুর ডিম ছিল না, সুন্দরী বউ বিয়ে করে পাহারাদার হয়েই কেটে গেল জীবন। সে একা বাড়িতে থাকতেও ভয় পায়, তাই তারা বাপের বাড়ি গেলে সেও সঙ্গে যায় ফ্রি। অহিভূষণের জীবন প্রণালী হাইজ্যাক করে নিয়েছে তারা। তারা যত জানে সে তার কতটুকু জানে। অদেখা এক ড্রাইভার পত্নী তরঙ্গের নামে গ্রেভ গভির করে তারা নিজেকে উপেক্ষিত সাজায়। আবার গভির রাতে একজন আর একজনের মুখে তাকিয়ে বলে, 

— আচ্ছা, তুমি যদি জানতে পারো আমি আর একজনকে ভালবাসি, তুমি কী করবে? 

রেশম তুলতুলে পঞ্চান্ন বছরের শরীরে ডুবে যেতে যেতে চুম্বনে মুখ বন্ধ করে দেয় অহিভূষণ। দীর্ঘক্ষণ অর্গলবদ্ধ থাকার পর শ্বাস নেওয়ার অবকাশে আবার বলে,

— বললে না তো? 

অহিভূষণের তখন জবাব দেওয়ার সময় কোথায়। তবু বলে, 

— করলে করবে, আমার ভাগেরটা কম না পড়লেই হল। 

— ইশ, শুধু ভাগাভাগি, শরীর ছাড়া কিছু নেই। 

—এমন একটা দেহ পেলে অমরত্ব প্রত্যাখ্যান করতে পারি ম্যাডাম। আমারও একজন আছে জানো?

— জানি, আমিও বলেছি আমার আছে, কাটাকাটি।

— তোমার নেই, আমি জানি। 

— কচু জানো, ধান খেয়েছো মুরগি যাবে কোথায়? অহি ছাড়া গতি নাই। 

— মানুষটা একটা সিরিয়াস কথাও বলতে পারে না। ষাট বছর বয়সেও শখ যায় না। 

অহিভূষণ তখন আলো জ্বালিয়ে আপন রমণীর নগ্নিকা রূপ দেখছে আর অবাক হচ্ছে। বলছে,

—শখের আর কী দেখেছ, এই রূপ দেখেছিল কালো রাজা, দেখেছিল তার ডেসডিমোনাকে, বলেছিল আমি একটি অপাপবিদ্ধ সন্তানের জন্ম দিতে চাই। 

— তোমার তো আছে সন্তান।

— সে তো তোমার

— আমাদের।

— তবে যে বলো…। 

— সে তোমাকে আঘাত করতে, যখন দেখি তুমি আর আমায় ভালবাসো না !

— বাসি তো। 

— তবে বলো আই লাভ ইউ। 

— ধুর,ওসব বলে কি লাভ হয়? 

বলেই অমর কবির কবিতা আউড়ে আবার মুখের কথা বন্ধ করে। বলে

— তৎকাল যৌগে ক্রমৈঃ। 

আর তারাও বন্দী বিহঙ্গের মতো বিভিন্ন বিভঙ্গে শরীরী খেলায় মেতে ওঠে। পঞ্চান্ন বছরের এই অপরূপা রূপসীকে এমন সোহাগী করে তোলা সহজ কর্ম নয় অহিভূষণের, সে এক সাধনার ধন। অহিভূষণ তার নিজস্ব রমণীকে এমন উদ্ধৃত প্রগলভ হতে দেখে নি বহুদিন। 

আবার যেদিন তারার শরীর ডাকে সেদিন অহিভূষণ আগের দিনের অসমাপ্ত বিষয় তালিকা নিয়ে আলোচনা শুরু করে। বলে, 

— তুমি যে বলেছিলে তোমারও আছে একজন, আমি চিনি?

— চেনো তো বটেই।

— বাড়িতে আসে, থাকে? আমি অফিসে গেলে তোমরা একা বাড়িতে?

— কী? একা বাড়িতে কী? সবাইকে সন্দেহ করবে নাকি তোমার ধর্মশালার? 

আসামের ছেলে অহিভূষণের বাড়িতে তার আত্মীয় স্বজন বন্ধুবান্ধরের জন্য অবারিত দ্বার। সে অফিসে চলে গেলে অতিথিরা থাকে তারার তত্ত্বাবধানে। অহিভূষণের বন্ধু মৃন্ময় অনিমেষ বিপ্লবকে তো দাদা ডাকে তারা, শুধু অহিভূষণের প্রাক্তন ছাত্র অমিত এলে অন্য রকম। অমিত বয়সে কম একটু বেশি স্মার্ট, এছাড়া কিছু না। সবাই এলেই তারা অন্যরকম। তাহলে তো ড্রাইভার চক্রধরকেও সন্দেহের তালিকায় রাখতে হয়, কী সুপুরুষ। ডাক্তার সিদ্ধার্থ বলেছিল গাড়ির মালিক থেকে ড্রাইভার সুন্দর। অহিভূষণ এসব গায়ে মাখে না, সে জানে তার গায়ের রং মাজা, নামটা সেকেলে, তারার নামও তো একালের নয়। অহিভূষণ তারাকে বলে,

—ডাক্তার সিদ্ধার্থ কি তোমার আকাঙ্খার পুরুষ?

—হতে পারে। 

তারা মুচকি হাসে।

অহিভূষনের জীবন তছনছ করে পঞ্চান্ন বছর বয়সে চলে যে যায় তারা। দুদিনের জ্বরে হার্টফেল করে কী কেউ চলে যেতে পারে, তবু তো গেল। তারার ছেলে চেন্নাই থেকে ফিরে এসে বলল, 

— এরকম হতেই পারে না। 

অহিভূষণকে বলে,

— কোন ডাক্তার দেখিয়েছে, দেখি প্রেসক্রিপশন। সবকিছু দেখে ছেলে বলে,  

— হুম। 

তরঙ্গকে প্রথম দেখে অহিভূষণ, সত্যি আগুন রূপসী তার ড্রাইভারের বউ, কত পদ রান্না করে খাওয়ালো। কতবার আচল বুকের মাঝখান দিয়ে কাঁধের ওপারে গেল। দুবুক খুলল আবার আঁচল খুলে ঢাকল। অহিভূষণ চক্রধরকে বলে তরঙ্গকে নিয়ে চলে আসতে পারে তার বাড়ি

ছেলে নকুলেশ্বর কি তাহলে কিছু সন্দেহ করছে। ছেলে বাপের হাত ধরে থাকে, রাতে অহিভূষণ ঘুমায়। সকালে ঘুম থেকে উঠে একা একা কাঁদে, বুক ফেটে যায় কান্নার চোটে। ছেলে সব দেখে। বলে, কাজ চুকলে বাপকে নিয়ে যাবে। অহিভূষণ বলে যাবে না, বিবাহিত ছেলে তো আর সারাজীবন বাপের হাত ধরে ঘুমোবো না। চক্রধর বলে, সে থাকবে স্যারের সঙ্গে, এও তো সমাধান নয়, তারও তো তরঙ্গ রয়েছে। চক্রধর বলে, কিছুদিন তো থাকি। রাতে শোয়ার আগে একবাড়িতে অহিভূষণ চক্রধরের সঙ্গে তারাকে নিয়ে কত কথা বলে। অহিভূষণ একথা সেকথার পর জানতে চায়, বউদি কোথায় কোথায় যেত, কোন মন্দিরে কোন বন্ধুর বাড়ি। চক্রধর জানায়, ডাক্তার বাবুর বাড়ি নিয়ে যেত প্রায়ই। 

— কোন ডাক্তার, সিদ্ধার্থ সেন? 

— হ্যাঁ স্যার। সিদ্ধার্থ ডাক্তার তো একা থাকে বিয়ে করে নি। 

গলার স্বরে রুক্ষতা নিয়ে চক্রধরকে বলে, 

— আগে বলোনি কেন? 

— বউদি না করেছে আপনাকে বলতে। 

এরকম একেক রাতে এক এক গল্প বলে চক্রধর। কখনও অমিতের সঙ্গে সিনেমা দেখার গল্প। মৃন্ময় অনিমেষ বিপ্লবকে নিয়েও গল্প বলে। অহিভূষণ কাকে সন্দেহ করবে, মিছিমিছি সিদ্ধার্থকে নিয়ে ভেবেছে। সিদ্ধার্থ ওরকম মানুষই নয়। কাজের মেয়ে ছবিকে দেখাতে নিয়ে গেছে সে কথা প্রথম দিন বলেনি চক্রধর। অহিভূষণ বুঝতে পারে ওর বাড়ির অতিথিদের মধ্যেই যে কেউ তাও সত্যি নয়। অন্য কেউ হবে মেঘের আড়ালে। তাহলে চক্রধরের উদ্দেশ্যটা কী, ওকে বিভ্রান্ত করে ওঁর কী লাভ। নাকি চক্রধরই আসল কালপ্রিট। দুমাস পর অহিভূষণ সিদ্ধান্ত নেয় চক্রধরকে এবার ছাঁটাই করবে। তার এখন স্থায়ী ড্রাইভারের দরকার নেই, সেন্টার থেকে আনিয়ে নেবে ঘণ্টার হিসেবে। সেইমতো চক্রধরকে জানিয়ে দেয় সামনের মাস থেকে আর তার দরকার নেই। চক্রধর কিন্তু সেয়ানা ড্রাইভার, চাকরি গেছে তো কী হয়েছে অহিভূষণকে অনুরোধ উপরোধ কিছুই করে না। যাওয়ার আগে পরদিন তার বাড়িতে নেমন্তন্ন করে যায়। বলে, 

—দুটো ডাল ভাত খাবেন স্যার। তরঙ্গ বলে দিয়েছে। 

তরঙ্গকে প্রথম দেখে অহিভূষণ, সত্যি আগুন রূপসী তার ড্রাইভারের বউ, কত পদ রান্না করে খাওয়ালো। কতবার আচল বুকের মাঝখান দিয়ে কাঁধের ওপারে গেল। দুবুক খুলল আবার আঁচল খুলে ঢাকল। অহিভূষণ চক্রধরকে বলে তরঙ্গকে নিয়ে চলে আসতে পারে তার বাড়ি। নিচের তলার বড়ো ঘরটা তো খালিই পড়ে আছে; ভাড়া দিতে হবে না। চক্রধর রাজি হয় না, পতিগত প্রাণ তরঙ্গ রাজি না অরাজি বুঝা যায় না। ভাল কথা, নিজের বাড়ি ছেড়ে কেন যাবে, অহিভূষণ তাও চক্রধরকে ছাড়ায় না, বলে যেমন আসে তেমন আসতে। তবে চক্রধরের উপর মানসিক অত্যাচারের বাড়িয়ে দেয়। তারা বেঁচে থাকতে যেসব ছোটোখাটো চুরি ধর্তব্যের মধ্যে আনত না, সে সব আভাসে ইঙ্গিতে এবার বলতে থাকে। আবার গাড়ি চালাতে চালাতে গাড়ি লাফিয়ে উঠলে রাজ্য সরকারের রাস্তার উপর দোষারোপ করলে সাবধান করে দেয়, 

—গাড়িটা দেখে চালাও চক্রধর। 

আবার মাছ মাংস কিনে বাড়িতে এসে বলে,

— ধুর, কাজের মানুষকে আর তেমন রাঁধতে পারে তুমি নিয়ে যাও, তরঙ্গ রাঁধলে আমাকে একটু দিয়ে যেও। 

তরঙ্গ রাঁধে অহিভূষণ খায়। বাঙালবাড়ির মেয়ে বলে তরঙ্গ কত রকম রাঁধতে জানে, ভাজা বড়া শাক পাতুরি ভাপে ছেঁচকি রসা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে রাঁধে। টিফিন কৌটো আসে ফিরে যায় শূন্য। তরঙ্গের অনুরোধে প্রায়ই চক্রধরের বাড়িতে যায় অহিভূষণ। তারাকে দেখেনি তবু তরঙ্গ তারা ম্যাডামের কথা বলে স্যারের মনের কাছাকাছি পৌঁছতে। শরীরটাও তো মনের পাশেই থাকে, একই গাঁয়ের পড়শি। অহিভূষণ ও তরঙ্গকে বলে, 

—তোমার বর চক্রধরকে খুব পছন্দ করত ম্যাডাম। আমাকে বলত ওর বেতন বাড়িয়ে দেওয়ার কথা। আমি তো জানতাম যা দিই না কেন তোমার ম্যাডাম ঠিক পুষিয়ে দেবে। একস্ট্রা ইনকাম কমে গেল তোমার বরের। আমি ঠকাব না, তোমাকেই দেব বাকিটা, দিচ্ছি না বল? বাজার করার অভ্যাস তো বন্ধ করিনি, তোমার বাড়িতে পাঠিয়ে দিই। আরও দেব, ক্যাশ দেব। 

—আর কেন স্যার, আপনি তো দিচ্ছেন। 

— তোমার বর চক্রধর খুব চালাক। সব কথা খুলে বলে না। ওকে দিয়ে হবে না। যা করার তোমাকেই করতে হবে। কিছু খবর দিতে হবে। কিন্তু গোপনে। পারবে তো? 

তরঙ্গ এক অভিলন ভঙ্গিতে সম্মতি জানায়। বুকের কাপড় ঠিকঠাক করার ছলে স্বল্প উন্মুক্ত করে, মানে হ্যাঁ। অহিভূষণ বলে, 

— তোমার ম্যাডামের চক্কর কার সঙ্গে ছিল চক্রধর জানে, তোমাকে ডিটেলস জেনে বলতে হবে। 

অহিভূষণকে অবাক করে তরঙ্গ জানায় সে সব জানে। বলে,

— তোমার বন্ধু অমিতটা ভালো না। 

—অমিত না সিদ্ধার্থ ডাক্তার? 

—না না। অমিত ঠাকুর, দিল্লি থেকে এসে পড়ে থাকত। তোমার তো ছাত্র, গুরুপত্নীর সঙ্গে ওর এত কিসের গুজগুজ ফুস ফুস। বউয়ের সঙ্গে নাকি বনিবনা নেই, সব তোমার বউকে নিয়ে।

—ধেৎ, অমিত কী করে হয়, আমার স্টুডেন্ট

— তোমার তারা বউও তো ছাত্রী। 

— কে বলল তোকে, চক্রধর সব উলটো খবর দেয়। আমরা প্রেম করে বিয়ে করেছি। 

—তবে চক্কর থাকলেও তোমার বউ তোমাকেই বিয়ে করত।

— তুই কি জ্যোতিষ নাকি? 

—তারা বউ তোমাকে ভালবাসত। 

—হুঁ। 

— হুঁ কী, ঠিক কিনা বলো? 

—আমার বউ আমাকে ভালবাসবে না তোর বরকে ভালোবাসবে?

—বাসতেও তো পারে বস। 

—যত সব ভুলভাল। 

অহিভূষণ তো তরঙ্গর মুখে তুমি শুনে অবাক, ম্যাডাম না বলে তারা বউ, সেও তাই ছুটিযে দিল তুই তোকারির ঠেলাগাড়ি। সে তরঙ্গের হাতে দাদনের টাকাও গুঁজে দিয়ে আসে। 

ডিব্ৰুগড়ের বিপ্লবকে দিয়ে অমিতকে টাইট দেওয়ার কথা ভাবে অহিভূষণ। এক মামুলি পান দোকানি, শান্তি পাড়ায় জমজমাট দোকানে কত কিছু পাওয়া যায়। তিন তলায় অহিভূষণের ভাড়া ফ্ল্যাট আর  নিচে বিপ্লবের কাত্থা আর বেগর কাত্থা একশ বিশ তিনশ জর্দা। অহিভূষণ বলে, উপর বিবিকা মকান আউর নীচে পান কী দোকান। বিপ্লব দিনে দুবার তিনবার পান পাঠায়। রাতে দোকান বন্ধ করে কোক পেপসি চপ কাটলেট নিয়ে আসে। ছুটির দিন অহিভূষণ সহ সিনেমা দেখতে যেত জ্যোৎস্নায় বউদিকে নিয়ে। শাড়ি কিনে দেয় বউদিকে দামী দামী। বিপ্লবের দোকান লাটে উঠতে উঠতে অহিভূষণের অস্থায়ী আস্তানার লটবহরও চলে যায় কলকাতা। বদলি দোকান নেই তাই ভেরেণ্ডা ভাজতে ভাজতে বিপ্লবও চলে আসে বউদির টানে। তবে অহিভূষণ নিশ্চিত তার তারা আর যাই করুক এই চামচিকে মার্কা ছোকরার সঙ্গে ফস্টি নষ্টি করতে পারে না। কিন্তু বিপ্লব, যেরকম এগ্রেসিভ, কুছ ভি হো সকতা। তাই কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলতে প্রাক্তন পান দোকানিকে সুপারি দেওয়ার কথা ভাবে। 

ওএনজিসির অনিমেষ তারার মতো বোন পো, মাসততো দিদির ছেলে। ছোটো বেলা থেকেই অনিমেষ তারার ন্যাওটা অনিমেষের বাবা বাংলার অধ্যাপক কবি। অনিমেষও কবিতা লেখে, গল্প টল্পও লেখে শরীরী প্রেমের। অহিভূষণ আর তারার মধ্যে দাম্পত্য কলহেও সে ঢোকে যায় মাসীর পক্ষে। আসকারা নিয়ে তারা অহিভূষণকে বলে, 

—রইল তোমার সংসার, আমি অনিমেষের কাছে চলে যাব। কিরে দেখবি না? অনিমেষ তখনই

প্রস্তুত। বলে, 

—চলো। 

দেবী দিদি ছেলের বিয়ের জন্য ব্যস্ত হতেই সে বলে বিয়ে করবে না, করলেও মাসির মতো বউ চাই। 

এদের মধ্যে মৃন্ময় একটু অন্যরকম। অহিভূষণ বলে ভালমানুষ টাইপের গুণ্ডা। মৃন্ময় বলে, 

—সেটা আবার কী রকম। 

—তুই যেরকম। 

তারাদের পাড়ার ছেলে মৃন্ময়ের ভয়ে ভজমালী পাড়ার মেয়েদের কেউ উত্যাক্ত করেনি কোনোদিন। অহিভূষণের লাইনে তারাকে দেখে মৃন্ময় অনুমোদন দিয়েছিল একবাক্যে, বলেছিল,

— ওতো মেয়ে নয় রে বাইসন, দারুণ মেয়ে। বিয়ের পর তো মিনুদার নামে আহ্লাদে তারা অষ্টাশিখানা। ডিসেম্বরের শেষদিন বাড়ি এসে বলল,

— চল তারা, পাটি করে আসি।

— চলো, কোথায় যাবে? 

— শিলং যাবো। 

শিলং গিয়ে পাড়ার দাদা আর তারা পার্টি করল, অহিভূষণ একা হোটেল ঘরে জেগে থাকল। নতুন বছরে বাসে করে ফিরেও এল তিনজনে গৌহাটি। এক সিটে মৃন্ময় ওরফে মিনুদা আর তারা জানালার পাশে আর অহিভূষণ আইল সিটের অবজ্ঞায়। তারা বলে, 

— মিনুদা ওরকম, আমাকে ভালবাসে। 

— আর আমি? 

— তুমি তো স্বামীজি, হিংসা করো না। 

অহিভূষণ ঘটনাটা নিয়ে মাথা ঘামিয়েছিল। মৃন্ময়ের সঙ্গে সম্পর্ক কাট করে দিয়েছিল, কলকাতায় কী করে যে আবার জুড়ে গেল তারার একজন হয়ে।  

জমানো টাকা পেনশনের টাকা জমে জমে অহিভূষণের এখন অনেক টাকা। তারার প্রেমিকা খুঁজতে এখন ড্রাইভার চক্রধরের সুন্দরী বউয়ের পেছনে খরচ করে দুহাত খুলে। তরঙ্গও এখন সূত্র ধরিয়ে দিতে যখন তখন চলে আসে অহিভূষণের বাড়িতে। সে তরঙ্গকে তারার পুরনো কাপড় চোচাড় দিতে চাইলে নেয় না। বলে, 

— সঙ্গে চত্রধরের জন্যেও কিছু একটা না দিলে সন্দেহ করতে পারে। 

অহিভূষণ পুরণো ব্লেজার দেয় সার্ট দেয় নতুন লুঙ্গি দেয়। বিনিময়ে তরঙ্গ সুখ দেয় সূত্র দেয়।

তেলে জলে মিশ খায় না। তারার সঙ্গে তরঙ্গের কিছুই মেলে না। দেখতে সুন্দর মাকাল পুষ্প একটি। অহিভূষণ তারাকে হারিয়ে এখন দিশেহারা। কাজটা সে ঠিক করে নি। তারা বেঁচে থাকলে তার সুখ থাকত আনন্দ থাকত। অহিভূষণ জানে তারা যখন তার সঙ্গে থাকে তখন সে তার একান্ত আপন। সুখের সময় অহিভূষণ কত কথা বলে। বলে সোনাবাবু। বলে আই লাভ ইউ। তবে তারার তো একটা অতৃপ্তিও ছিল, নইলে কী আর কেউ চরম সুখের মুহুর্তে বলে সে একটা অন্যপুরুষ কামনা করে, অন্যের সঙ্গে খেলতে চায় শরীর খেলা। প্রতিদিন, যে যে রাতে তারা মিলিত হয়েছে তারা সুখ যেমন দিয়েছে অপমানও করেছে। সে কত আর  সহ্য করবে, যা করেছে ভালই করেছে। অহিভূষণ মুখে কিছু বলেনি তারার সুন্দর শরীর দেখতে দেখতে অন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে এসেছে মাথার উপর বাহারি পর্দা সরিয়ে। কামুক আলোয় চেয়ে চেয়ে দেখেছে আর দুহাতে জড়িয়ে ধরেছে কামনার বহ্নি মুখ। শেষ দিকে গলার কাছে নিয়ে এসেছে দুহাত। সজোরে শ্বাসনালী টিপে ধরতে চেয়েছে। বলেছে অন্য কারো দিকে তাকালে গলা টিপে মেরেই ফেলবে। তারা হেসে বলেছে, 

— রাগছো কেন গো, আমিতো তোমারই আছি। 

বলে আরও মোহময়ী হয়ে উঠেছে। বলেছে, 

— মেরে ফেললেও আমি তোমারই থাকব। এখন একরকম একটু আগে অন্যরকম, এসব কী যে খেলা তার তারা সুন্দরীর। অহিভূষণেরও একই কথা সে তার আদরের ধনকে ভাগ করতে চায় না। সে বুঝতে পারে তাঁর বাড়ির ধর্মশালায়ই রয়েছে রাধাবিদ্যার এক গোপন পাঠশালা। দৃশ্যমান যাঁরা আছে তার বাইরে কী আছে কেউ, নাকি অহিভূষণ ধরতে পারছে না তারার অতি ঘনিষ্ট জনকে। তারার কথাকেই তাহলে ধ্রুবতারা মানতে হয়, জীবনে যেমন মরণেও তো সে তারই থাকবে। বেঁচে থাকতে যখন অন্য পুরুষের খোঁজ পায় নি তাই এবার সে নিশ্চিন্তে এগিয়ে যাবে গভিরে। তরঙ্গই তাকে পৌঁছে দেবে সঠিক শরীরে।

♦—♦♦—♦♦—♦♦—♦


  • Tags:

Read by:

❤ Support Us
Advertisement
homepage block Mainul Hassan and Laxman Seth
Advertisement
homepage block Mainul Hassan and Laxman Seth
Advertisement
শিবভোলার দেশ শিবখোলা স | ফ | র | না | মা

শিবভোলার দেশ শিবখোলা

শিবখোলা পৌঁছলে শিলিগুড়ির অত কাছের কোন জায়গা বলে মনে হয় না।যেন অন্তবিহীন দূরত্ব পেরিয়ে একান্ত রেহাই পাবার পরিসর মিলে গেছে।

সৌরেনি আর তার সৌন্দর্যের সই টিংলিং চূড়া স | ফ | র | না | মা

সৌরেনি আর তার সৌন্দর্যের সই টিংলিং চূড়া

সৌরেনির উঁচু শিখর থেকে এক দিকে কার্শিয়াং আর উত্তরবঙ্গের সমতল দেখা যায়। অন্য প্রান্তে মাথা তুলে থাকে নেপালের শৈলমালা, বিশেষ করে অন্তুদারার পরিচিত চূড়া দেখা যায়।

মিরিক,পাইনের লিরিকাল সুমেন্দু সফরনামা
error: Content is protected !!