- ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
- নভেম্বর ২, ২০২৫
হিরণবালা। পর্ব ২৭
হিরণের মাথায় ঘুরতে থাকে ওর বদলির ভাবনা , ওজানে গোবিন্দর ওপরমহলে কোনো যোগাযোগ নেই । ওকেই দ্রুত রাইটার্সে যেতে হবে হরিহর ভৌমিকের খোঁজে...
৫১
হরিহর ভৌমিক মানুষটির যেন একটুও পরিবর্তন হয়নি এই ক-বছরে। প্রায় বছর কুড়ি পরে হিরণ হরিহর ভৌমিককে দেখছে। কিন্তু চেহারায় একটুও পরিবর্তন হয়নি। চুলে সামান্য পাক ধরেছে এই যা। হরিহর ভৌমিক হিরণকে বললেন, একেবারে ঠিক সময়ে এসেছ মা। জানি না কতদূর কী করতে পারব। তবে তিন মাস পরে আমি রিটায়ার করব। আর তিন মাস পরে এলে আমার সঙ্গে দেখাই হত না।
হিরণের মনে হল, এ নিশ্চয়ই ঈশ্বরের কৃপা। গত কয়েক বছরে দিন যত গিয়েছে ও ততই ক্রমশ ঈশ্বরের ভক্ত হয়ে উঠেছে। বেশ কিছুদিন ধরেই হিরণ ভাবছিল বাঁকুড়ার ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘে গিয়ে ও দীক্ষা নেবে। কিন্তু সেটা আর করব করব করেও করে ওঠা হয়নি। এবার আর ফেলে রাখবে না এ-কাজ। জীবনে একজন গুরু দরকার। তিনি পথ দেখাবেন। তিনিই ঈশ্বরের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেবেন। ঈশ্বরের কাছে নিজেকে আরও বেশি করে সমর্পণ করতে হবে হিরণকে। ঈশ্বরের কৃপা না হলে আজ ওর কোনোমতেই হরিহর ভৌমিকের সঙ্গে দেখা হত না।
হরিহর ভৌমিক ইতিমধ্যেই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে হিরণের কাছ থেকে জেনে নিয়েছেন সব কথা। হিরণ মুখে যতখানি পারা যায়, বলেছে। বলেছে ওর একার লড়াইয়ের কথা। বলেছে এই লড়াই শুরুই করা যেত না হরিহর ভৌমিক না থাকলে। আজ আবার হরিহর ভৌমিকেরই সাহায্যপ্রার্থী হিরণ। একবার ওর সংসার ভেঙেছে। প্লাবনে খড়কুটোর মতো সে ভেসেই গেছিল। এইবার আর ও চায় না ওর সংসার তিন টুকরো হয়ে তিন জায়গায় পড়ে থাকুক।
সব শুনে হরিহর ভৌমিক বললেন, সাধারণত মাঝে মাঝেই তোমাদের ট্রান্সফার হয়ে থাকে মা। নিয়ম কানুন মেনেই হয়।
হিরণ বলল, আমার তো দুইবার হইসে।
হরিহর ভৌমিক বললেন, কাজেই আরও একবার হতেই পারে। কিন্তু আমি রিটায়ার করার আগেই সব কাগজপত্র তৈরি করতে পারব কি না জানি না। আর একটু আগে যদি আসতে মা, তাহলে আমি নিশ্চিত তোমার ট্রান্সফারটা বেলিয়াতোড় হেলথ সেন্টারে করিয়ে দিতে পারতাম। এখন সময় অনেক কম। তবু আমি চেষ্টা করব।
তিনটি মেয়ের মধ্যে একটি মেয়ে তো রীতিমতো সুন্দরী। কিন্তু তার মুখের মধ্যে কেমন যেন একটা ঔদ্ধত্যের ছাপ রয়েছে । দেখেই কেমন যেন মনে হচ্ছে কারও কথা শুনবার মতো মনই নেই মেয়েটির। ছবিটা মনোযোগ দিয়ে হিরণ দেখছে দেখতে পেয়ে সুরেন গোঁসাই বলল, এই মেয়েটি কলকাতার। কলেজে পড়ে। বাংলা অনার্স।
বলেই হরিহর ভৌমিক খসখস করে একটা সাদা কাগজে দরখাস্ত লিখতে শুরু করলেন। ওর চাকরির দরখাস্ত হিরণ নিজে লেখেনি। এইবার যে নিজের থেকেই ট্রান্সফার চাইছে, সেই দরখাস্তও হিরণের নিজের লেখা হল না। দরখাস্তটা লেখা শেষ হলে হরিহর ভৌমিক কাগজটা বাড়িয়ে দিলেন হিরণের দিকে। হিরণ যেটুকু ইংরেজি পড়তে আর বুঝতে পারে তাতে দেখল কেন ওর ট্রান্সফারটা খুবই প্রয়োজন সেটা ভীষণ গুছিয়ে লিখেছেন হরিহর ভৌমিক। ও তখনও কাগজ থেকে মুখ তোলেনি। তার আগেই হরিহর ভৌমিক বললেন, এই দরখাস্তটা নিয়ে গিয়ে সই করে তোমাদের হেলথ সেন্টারের মাধ্যমে প্রপার চ্যানেলে এখানে পাঠাও। একটুখানি সিএমওএইচ-এর দপ্তর থেকে খোঁজ নিয়ে জানাবে কবে চিঠিটা আমাদের পোস্ট করা হল। তোমাকে আর এখানে আসতে হবে না মা। একটা রেজিস্ট্রি ডাকে আমাকে শুধু দিনটা জানিয়ে দিও, তাহলেই হবে। তাহলে আমি অফিসের ফোন নম্বর দিয়ে দেব। সাড়ে দশটার পর ফোন কোরো কাজের দিনে। আমাকে পাবে। আমার ঢুকতে ঢুকতে সাড়ে দশটা বেজে যায়। আর ডাক্তার শিটকে বোলো সিএমওএইচ যেন চিঠিটা এখানে ফরোয়ার্ড করে দেন, সেটুকু দেখে নিতে।
হিরণের মনে হচ্ছিল কোনো মানুষের কণ্ঠস্বর নয়, ও শুনতে পাচ্ছে এক ঐশী স্বর। যেন সাক্ষাৎ একজন দেবদূত কথা বলছেন ওর সঙ্গে। কিংবা হয়তো স্বয়ং ঈশ্বরই। ঈশ্বর তো নানা ভাবে, নানা রূপে আবির্ভূত হন মানুষের সামনে। এই হরিহর ভৌমিক না থাকলে ওর চাকরিটাই হত না। আর আজ মনে হচ্ছে এই মানুষটার জন্য ওর ট্রান্সফারটাও নিশ্চয়ই হয়েই যাবে। ঈশ্বর হরিহর ভৌমিক নয় তো আর কে!
জীবনও কী বিচিত্র ! এই ভালো, তো এই খারাপ। বেঁচে থাকা মানে আসলে সত্যিই লাঠির ডগায় পুঁটলি বেঁধে নিয়ে একজন পথিকের মতো অজানা এক গন্তব্যের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়া। হাঁটতে থাকা, হাঁটতে থাকা, শুধুই হাঁটতে থাকা। কখন যে রাস্তা কেমন হবে, বোঝা মুশকিল। কোন বাঁকের আড়ালে জীবন কী লুকিয়ে রেখেছে — আশ্চর্য ধন, নাকি অভূতপূর্ব বিপদ– তা কেউ জানে না। তবে আজ রাইটার্সে এসে হরিহর ভৌমিকের দেখা পেয়ে এবং তাঁর এই অদ্ভুত প্রশ্রয় পেয়ে হিরণের মনে হচ্ছে লাঠির ডগায় পুঁটলি বেঁধে নিয়ে একজন পথিক যদি হাঁটতে শুরু করে, জীবন শেষ পর্যন্ত তার ঝোলা ভরে দেয়। তাকে ফেরায় না।
৫২
গোবিন্দ হাসপাতালে চাকরি পাওয়ার পর থেকেই আবার হিরণের বাড়িতে সুরেন গোঁসাইয়ের আনাগোনা বেড়েছে। নানা জায়গা থেকে পাত্রীর খোঁজ নিয়ে আসছে সুরেন গোঁসাই। গোবিন্দর বিয়ে সে বুঝি দিয়েই ছাড়বে। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই নতুন নতুন একজন পাত্রীর সন্ধান নিয়ে হাজির হচ্ছে সুরেন গোঁসাই। লোকটার ধৈর্য আছে বটে। কোনো একটা কাজের পেছনে লেগে থাকতে জানে। তবে এবার এখনও পর্যন্ত যেসব পাত্রীর ছবি নিয়ে এসেছে সুরেন গোঁসাই তাদের কাউকেই তেমন পছন্দ হয়নি হিরণের। গোবিন্দর জন্য খুব সুন্দরী বউ হিরণ চায় না। সুশ্রী হলেই হল। মঞ্জুরও তো সামনের দাঁত দুটো অল্প উঁচু। তাতে তো কিছু যায় আসে না। তাই সুন্দরী না হলেও চলবে কিন্তু মনটা ভালো হতে হবে গোবিন্দর বউয়ের। হিরণের পরিবারকে তো বাঁচিয়ে রাখতে হবে দুই বউকেই। যৌথ পরিবার দিনে দিনে আরও তো বড়ো হবে। ছবি দেখে একজন মানুষের মনের আন্দাজ হয় তো পুরোটা পাওয়া যায় না। কিন্তু, কিছুটা যায় বলেই মনে করে হিরণ। যে-কটি মেয়ের ছবি এখনও পর্যন্ত সুরেন গোঁসাই দেখিয়েছে তাদের কাউকে দেখেই হিরণের মনে হয়নি যে, তারা বেশ সহজসিধে মানুষ হতে পারে।
আজও এসেছে সুরেন গোঁসাই তিনজন পাত্রীর ছবি নিয়ে। মঞ্জু তাকে চা এনে দিয়েছে। চায়ে আয়েশ করে এক চুমুক দিয়ে সুরেন গোঁসাই বলে, দেখুন এই তিনজনের মধ্যে একজনের ছবি নিশ্চয়ই আপনার পছন্দ হবে।
হিরণ সুরেন গোঁসাইয়ের হাত থেকে ছবিগুলো নিল। তিনটি মেয়ের মধ্যে একটি মেয়ে তো রীতিমতো সুন্দরী। কিন্তু তার মুখের মধ্যে কেমন যেন একটা ঔদ্ধত্যের ছাপ রয়েছে। দেখেই কেমন যেন মনে হচ্ছে কারও কথা শুনবার মতো মনই নেই মেয়েটির। ছবিটা মনোযোগ দিয়ে হিরণ দেখছে দেখতে পেয়ে সুরেন গোঁসাই বলল, এই মেয়েটি কলকাতার। কলেজে পড়ে। বাংলা অনার্স।
মেয়েটি কলেজে পড়ছে শুনে সঙ্গে সঙ্গেই হিরণ ঠিক করল এর সঙ্গে গোবিন্দর বিয়ে দেওয়া যাবে না। মেয়েদের পড়াশোনার বিরোধী সে নয়। কিন্তু গোবিন্দ কলেজ পাশ করেছে কেবলমাত্র পাস গ্রাজুয়েট হিসেবে। তার সঙ্গে অনার্স পাস করা কারও বিয়ে দিলে ভবিষ্যতে সমস্যা হতেই পারে। মঞ্জু আবার তেমন পড়াশোনা করেনি। মেয়েটি হয়তো এ-পরিবারে এসে মঞ্জুকে তেমন পাত্তাই দিল না। হতেই পারে এমনটা। হিরণ সুরেন গোঁসাইকে বলল, শোনেন, বেশি পড়াশোনা যানা মাইয়া লাগব না। আমার মঞ্জুর মতো সংসারী মাইয়া চাই।
সুরেন গোঁসাই সঙ্গে সঙ্গে বলল, তাহলে তিন নম্বর ছবিটা দেখুন। মেয়ের নাম শিখা মাইতি। বাবা মেদিনীপুরের হাইস্কুলের টিচার। মেয়েটি সবে ক্লাস টেন পাশ করেছে।
হিরণ দেখল মেয়েটি বেশ সুশ্রী। কেমন একটা নরম মায়া জড়িয়ে আছে মুখটিতে। এই মেয়েটি গোবিন্দর বউ হলে মন্দ হয় না।
হিরণের মুখের হাবভাব দেখে বোধহয় সুরেন গোঁসাই বুঝতে পেরেছে যে, হিরণের পাত্রীটিকে পছন্দ হয়েছে। তাই হিরণ কিছু বলবার আগেই সুরেন গোঁসাই বলে ওঠে, এরা কিন্তু ও-বঙ্গের নয়, এদেশী। আপনার আপত্তি নেই তো?
এ জিনিসটা আগে ভেবে দেখেনি হিরণ। এদেশীদের সঙ্গে তাদের অনেক কিছুই মেলে না এটা ঠিক, কিন্তু, এদেশের মানুষজন তো খারাপ নয়। হরিহর ভৌমিক কি খারাপ মানুষ ? তিনি তো খাস কলকাতার লোক। হিরণ তাই বলে, আমার কোনো আপত্তি নাই। আপনে পাত্রীপক্ষের লগে কথা কইতে পারেন। তবে তারা রাজি আছেন তো বাঙাল পরিবারে মাইয়া দিতে?
সুরেন গোঁসাই বলে, রাজি আছে বলেই তো ছবি নিয়ে এসেছি। বিয়ের বাজারে সরকারি চাকরির খুব ডিমান্ড এখন। মেয়েদের পরিবারের কাছে বাঙাল-ঘটি এসব কোনো ব্যাপারই না! কবে পাত্রী দেখতে যাবেন বলুন?
হিরণ বলল, দেরি করুম না। সম্ভব হলে সামনের রোববারই যামু।
সুরেন গোঁসাই বলল, ঠিকই তো। শুভস্য শীঘ্রম। শুভ কাজে আর দেরি করা কেন ?
রবিবার সকাল সকাল পাত্রী দেখতে বের হল হিরণ, সত্য, মঞ্জু গোবিন্দ আর তিতা। মেদিনীপুর কলেজ থেকে একটু দূরেই বাজারের গায়ে শিখা মাইতিদের বাড়ি। শিখার বাবা প্রভঞ্জন মাইতি আপাদমস্তক ভদ্রলোক। বড়ো চমৎকার আপ্যায়ন করলেন হিরণদের। তবে প্রভঞ্জন মাইতির বাবা নিরঞ্জন মাইতি বারবার জিজ্ঞেস করছিলেন, বাংলাদেশে হিরণদের কোনো আত্মীয় এখনো আছে কি না, বিয়ের পর শিখা কোথায় থাকবে, রামসাগরে নাকি বাঁকুড়ায়, এইসব। প্রথম প্রশ্নের উত্তরে হিরণ বলেছিল, আত্মীয় যারা আছে তাদের সঙ্গে ওদের আর কোনো যোগাযোগই নেই। আর দ্বিতীয় প্রশ্নের কোনো উত্তর তো হিরণদের কাছে ছিলই না। শিখা মাইতিদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সময় হিরণ বলে এল যে, দু-দিনের মধ্যেই ওদের মতামত প্রভঞ্জন মাইতিকে সুরেন গোঁসাই মারফত জানিয়ে দেবে।
শিখা মাইতিকে বেশ পছন্দই হয়ে গেল হিরণদের সবার। গোবিন্দরও। কিন্তু দু-দিন কাটার আগেই এসে পৌঁছল সুরেন গোঁসাই। বলল যে, শিখা মাইতির দাদু এই সম্বন্ধ এগিয়ে নিয়ে যেতে চান না। কোনো বাঙাল বাড়িতে ওরা মেয়ে দেবে না। হিরণের মনে হল, ওর গালে কেউ যেন সোপাটে একটা থাপ্পড় মারল।
বেশ রেগেমেগেই ও সুরেন গোঁসাইকে বলল, আপনার আরও ভালো কইরা ওগো মন বুইঝাই আগানো উচিত ছিল। এই কামটা এক্কেবারে ঠিক হইল না।
♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦
ক্রমশ..
আগের পর্ব পড়ুন: হিরণবালা । পর্ব ২৬
❤ Support Us







