Advertisement
  • ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
  • এপ্রিল ১৩, ২০২৫

ঝাঁ ঝাঁ রৌদ্রে অথবা ফিঙ-ফোটা-জ্যোৎস্নায়। পর্ব ১৩

নলিনী বেরা
ঝাঁ ঝাঁ রৌদ্রে অথবা ফিঙ-ফোটা-জ্যোৎস্নায়। পর্ব ১৩

।। ৩৬ ।।

 
       সওদাগরদ্বয়ের প্রস্তাবিত সময়সীমার অনেক আগে আগেই ‘খোল’ বা স্তুলভাগ, আগাগলুই পাছাগলুই, ‘নাব-তল’ বা পানিতরাসের মেরামতির কাজ তো হয়েই গিয়েছিল, অধিকন্তু খুঁজে খুঁজে জোড়ের তক্তার ফাঁক-ফোকরে তুলো গুঁজে গুঁজে সমস্ত ফাটাফুটো বুজিয়ে ফেলা হল।
 
‘খদির’ কাঠ এখানে আর কোথায় পাওয়া যাবে ? যা পাওয়া গেল ‘অর্জুন’ আর ‘বাবলা’, তাই দিয়ে তক্তা, তাও নেহাৎ মন্দ হল না। শাল, সেগুন, আসান ফেলে এখন তো জিলিপি, জাম, জারুল, তেঁতুল, শিমুলও চলে।
 
ওই আছে না –

 
“ শিমুল খুঁটার নৌকা তোমার হে,

ও নৌকা তলায় জলের ভারে,

শিমুল খুঁটার নৌকা তোমার হে…”

 
তবে দাঁড়, হাল, মাস্তুল, আড়মাস্তুল সব তো শালকাঠের, কাঠ যেমন হোক, তার উপর তামা-পিতলের স্যাঁকরারা ঝালাই করে এমন ‘গিল্টি’ মেরে দিল যে গোটা জাহাজটাই ঝকঝক তকতক করে উঠল।
 
ওয়াটগঞ্জ, হাওড়া-শিবপুর থেকে গুরু জোনসের কোম্পানির ক্যানভাস কাপড়ের জাব্দা পাল, পালের দড়ি, কাছি ও দাঁড় আটকানোর রশি এসেছে।
 
সেসব তো এনেছে বাশুলিচকের বুদ্ধেশ্বর লায়া আর বাড়চুনফলির লম্বোদর দলাইরা।
 
রংমিস্ত্রিরা এসে যখন জাহাজের ‘খোল’ বা  ‘স্তুলভাগ’-এর বহির্প্রদেশে রং করার কাজে হাত দিল, তখন মধ্যাহ্ন গড়িয়ে সূর্য অপরাহ্ণে হেলে পড়েছে, তারা নাকি অনেকটা দূরের গঞ্জ থেকে এসেছে।
 
কী গঞ্জ, কী তার নাম, আর কোনও কিছুই জিজ্ঞাসা না করে আমি তাদের বললাম, ‘বেশ তো আর দেরি না করে কাজে লেগে যাও, মশালের আলোয় সারা রাত্রিব্যাপী রং কর, রং তো কেনাই আছে।’
 
অতঃপর তারা তাদের সঙ্গে আনা গাবের আঠা জাহাজের চারদিক ঘুরে ঘুরে লাগাতে লাগল, এমনটা করতে আমাদের গ্রামের হংসী নাউড়িয়াকেও দেখেছি, গাবের আঠা গাবানো হয়ে গেলে তার উপর আলকাতরার গাঢ় পোঁচ মারা হত, এতে করে নৌকো বা জাহাজের খোল জলনিরোধক হত।
 
যতক্ষণে গাবের আঠা লাগানো হল ততক্ষণে ‘মহিষাসুর দঁক’-এর চবুতরায় সন্ধ্যা নেমে গিয়েছে, পাখপাখালিরা তারস্বরে কলরব করছে, এমনিতেই  গাছ-গাছালির সানু প্রদেশে অন্ধকার আগেভাগেই নামে।
 
আঠা লাগানো হল বটে তবে তা শুষ্ক হতে সময়ও দিতে হবে, নচেৎ সহজে রংয়ের ‘চিট্’ তেমন জোরালো হবে না। তার উপর তামার উপর লাগানো আঠা বলে কথা।
 
রংয়ের কাজে নিযুক্ত মিস্ত্রিরা জাহাজের খোলে গাবের আঠা মাখিয়ে কিছুক্ষণ হাত-পা ছড়িয়ে বসল,  গুয়া-পান  বিড়ি-তমাকু সেবন করল, কেউ কেউ দু-চাট্টা  ‘আফুয়া’ কথা বলতে লাগল, কেউ বা ‘ডক’-এর উপর গামছা পেতে কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে পড়ল, আঠা তো শুকোক আগে, তবে না !
 
পেটে টিপা-লাইট জ্বেলে ‘বাঘ-যুগনি পোকা’ অর্থাৎ জোনাকি পোকা আজ যেন সংখ্যায় অধিকতর হয়ে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। চারদিকে ‘রোঁদ’-এ বসা পাহারাদারেরাও মশাল জ্বালিয়ে দিয়েছে দ্বিগুণ-তিনগুণ।
 
নদীতে ভাসমান ‘উকো’-য় মাছমারারা তিন-সেল,  পাঁচ-সেল, আট-সেল টর্চের আলোর ফোকাস ফেলছে উপর্যুপরি, কখনও বা একবার জ্বালছে একবার  নেভাচ্ছে, সংখ্যায় যেন তারাও বেড়েছে আজ।
 
দূরবর্তী গ্রামে একটা কুকুর ডেকে উঠল, নিকটবর্তী গ্রামে ভরসন্ধ্যায় আচমকা একটা মোরগ একবার ডাকল, দুবার ডাকল, তিনবার।
 
আর এই সময়ই  ‘দিশাকাক’ অলম্ভুস দাঁড়কাকটা কোত্থেকে ডাকতে ডাকতে এসে বড় মাস্তুলটার মাথায় বসল। বসেই ক্ষেপে ক্ষেপে তিনবার ডেকে উঠল, কে জানে তার কী অর্থ !
 
আঠা শুকোতে প্রায় মধ্যরাত্রি হয়ে গেল, রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষ করে তারা রংয়ের কাজ ধরল, জাহাজের যেহেতু চার-চারটে মাস্তুল তাই তার রং হবে অবধারিতভাবেই ‘সাদা’, আগেও ছিল তাই।

 
“ চার মাস্তুল বিশিষ্ট নৌকার রং হয়েছে সাদা,

তিন মাস্তুল বিশিষ্ট নৌকার রং লাল,

দু-মাস্তুল যুক্ত নৌকার রং পীত বা হলুদ

এবং

এক মাস্তুল বিশিষ্ট নৌকার রং নীল।”

 
বইয়েই তো পড়েছি।
 
খাজাঞ্চি হেন লোকটা, আমি, সওদাগর ‘তপোসা’ আর ‘পালেকাথ’ তখনও জেগে, বুদ্ধেশ্বর লায়া আর লম্বোদর দলাই ধারেকাছে নেই, জাহাজের বাইরের খোলে, তলদেশে, আঠার উপর এক পোঁচ সাদা রং পড়েছে কী পড়েনি, হঠাৎ চিৎকার উঠল, “ পানি! পানি!! হু হু করি নালায় পানি আসেটে, রং যে ধুই-মুছি সাফা হি যাবে !”
 
তাই তো ! পানি ? জল ? নালায়, ৮০ হাত কাটা খালে জল আসছে কোত্থেকে, একফোঁটা বৃষ্টি নেই যেখানে ? তবে কী ‘আড়ঙঘাটা’-য় ১০ হাত প্রশস্ত মাটির বাঁধ কে বা কারা ভেঙে দিয়েছে? নদী তাই ঢুকে আসছে ?
 
যে যেখানে জেগেছিল, ঘুমিয়েছিল, সমস্তরকম মিস্ত্রিদের, কুলিকামিন মুনিশ- মাহিন্দরদের ডেকে এনে আড়ঙঘাটায় পৌঁছে দেখি, যা ভাবা হয়েছে ঠিক তাই, কাটা বাঁধের ‘ফোকল’ দিয়ে নদী ঢুকে আসছে হু হু করে !
 
জল এখনও হাঁটু পেরোয়নি, জাহাজের তলায় ঠেকনো দেওয়া আছে কম-সে-কম এক মানুষ, তবে এখন এখনই বাঁধটা পুনর্নির্মাণ করতে হবে, ঝুড়ি-কোদাল-বেলচা নিয়ে লেগেও গেল সব।
 

ক্রমে পুবদিগন্ত ফর্সা করে রাত্রি শেষ হল, পাখিরা কলরব করে উঠল, “পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল”, রংয়ের মিস্ত্রিরাও তাদের হাতের কাজ সম্পূর্ণ করে তেলে-ন্যাকড়ায় চোবাচুবি করে হাত মুছল।

 
ঘন্টা তিনেকের মধ্যে  বাঁধ হয়ে গেল ১০ হাতের জায়গায় ১৫ হাত, নদী নদীর মতোই আপন ধারায় আপন বেগে চলতে লাগল, এখন সওদাগরদ্বয় ময়না- তদন্ত করে দেখুক, এর পশ্চাতে আছে কে বা কারা ?
 
আমার তো মনে হয় বুদ্ধেশ্বর লায়া আর লম্বোদর দলাইরা, নচেৎ সেই মনা বিশুই চারু হাটুই সরো বেহেরারা, জমির প্রকৃত রায়তদাররা।
 
এখন একটুকু অসুবিধা তো হলই, একহাঁটু জলে দাঁড়িয়ে রংয়ের কাজ করতে হবে রং-মিস্ত্রিদের, তারা তা করছেও, মনের হরষে গীতও গাইছে, শুনতে পাচ্ছি –

 
“ বিষম নদীর ঢেউ রে তালছ তলছ পানি।

কি জানি পন্থেতে বন্ধুর ডুবছে নাও খানি…”

 
বাঁধ নির্মাণের কাজ সেরে সেখানকার লোকলস্কর কুলিকামিনরা ফের এখানে জাহাজের কাছে এসেছে, রাত এখনও ভোর হয়নি, রাত-পোহাতি-তারা, তারমানে শুকতারা এখনও ওঠেনি।
 
‘মহিষাসুর দঁক’-এর পাখপাখালিরাও জেগে উঠে  কিচিরমিচির শুরু করেনি, তবে ঝোপেঝাড়ে গাছপালার আড়ালে-আবডালে তাদের থেকে থেকে ধড়ফড়ানি ভদভদানির আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি, তারা বোধকরি সম্পূর্ণ জেগে ওঠার  প্রাক্-মুহূর্তে ‘উঠি’ ‘উঠি’ করছে।
 
আচ্ছা, ‘শিরিন’ আর ‘নেফারতিতি’ নিদ্রাতুর চোখে এখানে আসেনি বটে, আমি অন্তত দেখিনি, তবে ওই দুজন হলবলি রমণী যাদের সঙ্গে আমার ঈষৎ ভাব হয়েছিল, যাদের নাম এখনও জানা যায়নি, তারা কী ঝুড়ি-কোদাল-হাতে  বাঁধের কাজে এসেছিল ?
 
এলে তো বেশ হত, ভালোই হত, তারা যখন আমার হাত ধরে ফের সেই পোড়োবাড়িতে কি সংঘারামে, আমার পূর্বাশ্রমে, নিয়ে যাওয়ার কথা বলত, টানাটানি করত, আমি তাদের জিজ্ঞাসা করতাম, ‘শিরিন-ক্লিওপেট্রা যাচ্ছে, তোমরাও কী আমার সঙ্গে আমাদের গ্রামে যাবে ?’
 
ক্রমে পুবদিগন্ত ফর্সা করে রাত্রি শেষ হল, পাখিরা কলরব করে উঠল, “পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল”, রংয়ের মিস্ত্রিরাও তাদের হাতের কাজ সম্পূর্ণ করে তেলে-ন্যাকড়ায় চোবাচুবি করে হাত মুছল।
 
সূর্য খানিকটা উপরে উঠলে, রৌদ্র কড়া হলে, কড়া রৌদ্রের তাতে রং শুকিয়ে গেলে জাহাজের ‘খোল’ টঙ্ টঙ্ করে উঠল, রংয়ের ‘তক্ষণ’-রা আঙুলে টোকা মেরে ঠুকে ঠুকে নিজেরা তো দেখল, আমাদেরও দেখালো।
 
খাজাঞ্চি হেন লোকটা যে এতক্ষণ, এতক্ষণ কী আর, সারারাত্রিব্যাপী আমার সঙ্গে সঙ্গে থেকে বিড় বিড় করে যাচ্ছিল,  “সোণা ভরি যত তঙ্কা লবে তত পাই একুন করিয়া অঙ্ক রাখ তিন ঠাঁই”, ইত্যাদি কীসব ‘তোলা কসা’ ‘রতি কসা’ আউড়ে গেল, সেও এসে মেজাজে কয়েকটা থাপ্পড় মেরে ঠঙ্ ঠঙ্ করে জাহাজের খোলটা বাজিয়ে দেখল।
 
‘তঙ্কাবাবু’ ‘মন্দিলবাবু’-রাও একে একে এসে একেকটা থাপ্পড় মেরে দেখল, ততক্ষণে ফের একপ্রস্থ গুয়া-পান-তমাকু সেবন করে রংয়ের মিস্ত্রিরা গাওনা শুরু করেছে –

 
“ পক্ষী নয় পক্ষী নয় রে উড়াইয়া দিছে পাল ।

এই সে জহাযে উঠ্যা যাইবান যা থাকে কপাল …”

 
বেলার দিকে আরম্ভ হল ‘সিঁদুর দান’,  তখন এল পুরোহিত শ্রীবুদ্ধেশ্বর লায়া আর তার সহচর লম্বোদর দলাইরা, সঙ্গে এল ‘আঙরি’ ‘বিমলি’ ‘ঝুপা’ ‘ঝুমরি’-রা আর এল সেই দুজন হলবলি রমণীরা, অবশ্য ‘ক্লিওপেট্রা’ ‘শিরিন’-দের এখানে দেখতে পেলাম না।
 
বুদ্ধেশ্বর তার জন্য আনা নতুন ‘কাষায়’ পরে জলে নয়, ‘ডেক’-এর উপর বসে কীসব মন্ত্র পড়ে প্রথমে ‘আগাগলুই’ অর্থাৎ মকর বা হাঙ্গরের কপালে সিঁদুর দিয়ে স্বস্তিকা চিহ্ন আঁকল।
 
আঁকল আরও দু জায়গায়, ‘পাছাগলুই’-এ  আর ‘ডেক’-এর মধ্যিখানে, সেখানে সেখানে ধান-দুর্বা, শাঁখা-সিঁদুর-নোয়া আর লাল শালু ও মিষ্টি দিয়ে মন্ত্র পড়ে যথাবিহিত পূজা করল।
 
একে একে মেয়েরা, রমণীরাও ডেকের উপরে না  উঠে জলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই যতটা হাত যায় ‘আগাগলুই’ ‘পাছাগলুই’-এ হাত বাড়িয়ে সিঁদুর লেপে দিল, সিঁদুর দিল ‘খোল’-এর মাঝখানের দুধারেও।
 
আমাদের গ্রামের হংসী  নাউড়িয়ার নৌকোর পূজার্চনা, সিঁদুর দান, ইত্যাদি করে দিত দেখেছি হংসী খুড়িমা।
 
‘সিঁদুর দান’ পর্ব শেষ হলে সেই দুজন হলবলি রমণী চুপিসারে আমার কাছে এসে হাতে ধরে বলল, ‘এবার তো তোমাকে ও বাড়ি যেতেই হবে, ওখানে শ্রীশ্রী ৺ বাশুলিদেবীর পূজা যে !’

 

।। ৩৭ ।।

 
      ভালোই ভালোই সেই পোড়োগৃহে কী সংঘারামে  শ্রীশ্রী৺বাশুলিদেবীর মন্দিরে ফের পূজাও হয়ে গেল, মাছপোড়াসহকারে ষোড়শ প্রচারে,পূজা করল সেই ‘এক মেবা  দ্বিতীয়ং নাস্তি’ সেই ‘আদার বেপারি জাহাজের কারবারি’  বাশুলিচকের বুদ্ধেশ্বর লায়া আর তার সহচর বাড়চুনফলির লম্বোদর দলাইরা।
 
সওদাগর ‘তপোসা’ আর ‘পালেকাথ’ দুজনেই উপস্থিত ছিল, ছিল ‘শিরিন’-‘ক্লিউপেট্রা’-রাও, সেই দুজন হলবলি রমণী, যাদের নাম পরে জেনেছিলাম, ‘ফুল- টুসি’ আর ‘ফুলকলি’, ফুলের নামে নাম, তাদের সঙ্গে কথাও হয়েছিল, জাহাজে না ফিরে আমাদের  গ্রামে যাবে কী যাবে না, তৎক্ষণাৎ তারা অত্যধিক নিচু স্বরে বলেছিল, ‘পরে বলব।’
 
পরে অবশ্যই বলেছিল, ‘আমরা যাব, যাবই’।মন্দির চত্বরে পূজামণ্ডপে সারাক্ষণ তো তারা আমার সঙ্গে সঙ্গেই ছিল, ষণ্ডামার্কা দুজন নয় অন্তত চারজন লোক বুদ্ধেশ্বর লায়ার ‘শ্রেণীকক্ষ’-এর শিক্ষানবিশীরাই হবে হয়তো, আমাকে ফের চ্যাঙ-দোলা করে হাড়িকাঠে জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল !
 
কোনও ক্রমে সফল হয়নি, তার কারণ, এই দুজন হলবলি রমণী দৌড়ে গিয়ে খবর দিয়েছিল সওদাগর ‘তপোসা’ আর ‘পালেকাথ’-কে।
 
পরে জেনেছিলাম, এই চারজন আর ‘বলিদার’ মিলে নাকি বুঝিয়েছিল বুদ্ধেশ্বর লায়া আর লম্বোদর দলাইকে, সেইমতো তারাও সওদাগর-দ্বয়কে …
 
বুঝিয়েছিল যে, বলি না দিলে জাহাজ আর কোনও মতেই জলে ভাসবে না, কেননা সেই থেকে হাড়িকাঠ নাকি হাঁ-করেই আছে !
 
হাড়িকাঠ হাঁ করেই থাক, আমাদের এখন কেবলমাত্র অপেক্ষা, অপেক্ষা আর অপেক্ষা, কখন আসবে ‘বর্ষা’?
 
‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ ব্যুৎপত্তি করে যে, ‘বর্ষা১ স্ত্রী,  বহুব [ বর্ষ১ + অ (অচ্ ) অস্ত্যর্থে + স্ত্রী  আ  ( টাপ্ ) ; ছান্দস  ] ১. ‘বর্ষযুক্ত কাল’, ঋতুভেদ, প্রাবৃট্।২. ( একব ) বর্ষণ, বৃষ্টি’।
 
যতদূর জানি, বৈশাখ গত হয়েছে, জ্যৈষ্ঠও গতপ্রায়, গ্রীষ্মঋতু ভেদ করে বর্ষা আসছে, আষাঢ়-শ্রাবণ দু-মাসই তো এখানে বর্ষাকাল।
 
‘মেঘদূত’ আগেও পড়েছি, বুদ্ধেশ্বর লায়ার ‘পাঠকক্ষ’-য়েও আছে, পড়ে দেখতেও পারো –

 
“ তস্মিন্নদ্রৌ  কতিচিদবলাবিপ্রযুক্তঃ স কামী

নীত্বা মাসান্ কনকবলয়ভ্রংশরিক্তপ্রকোষ্ঠঃ।

আষাঢ়স্য প্রথমদিবসে মেঘমাশ্লিষ্টসানুং

বপ্রক্রীড়াপরিণতগজপ্রেক্ষনীয়ং দদর্শ” ।। ২ ।।

[ দয়িতার বিরহে বিরহী যক্ষ রুগ্ন হয়েছে, তার

হাতের বালা খসে গেছে। এইভাবে ওই পাহাড়ে

কিছু মাস থাকার পরে  আষাঢ় মাসের প্রথমদিনে

পাহাড় থেকে ঝুঁকে  সে ক্রীড়ামত্ত হাতির দাঁত

দিয়ে ওপড়ানো মৃত্তিকা-সদৃশ একখণ্ড মেঘকে

ঝুলে থাকতে দেখল ]

 
আমিও তো ‘জলঝিঁজরি’-র  টানে বাড়ি থেকে শাপগ্রস্তের মতো অপহৃত হয়ে দূর দেশে  থাকতে থাকতে রুগ্ন হয়ে এক্ষণে মুক্তির জন্য  একরাশ মেঘ তথা সমূহ বর্ষার অপেক্ষায় দিন গুনছি, ‘কবে আসবে বর্ষা ?’
 
ইত্যবসরে একদিন সত্যি সত্যিই গোধূলির অব্যবহিত পরে পরেই পশ্চিম দিকচক্রবালে বিদ্যুতের ঝিলকানি আর মত্ত হাতির মতো মেঘের ঘনঘটা দেখতে পেলাম, সেসব যেন ধীর লয়ে দিগন্ত রেখা ছেড়ে উপরের দিকে ক্রমে উঠে আসছে, ‘কবে আসবে বর্ষা ?’

 
“ তস্য স্থিতা কথমপি পুরঃ কৌতুকাধানহেতো –

রন্তর্বষ্পশ্চিরমনুচরো রাজারাজস্য  দধ্যৌ  ।

মেঘালোকে ভবতি সুখিনোহপ্যন্যথাবৃত্তি চেতঃ

কণ্ঠাশ্লেষপ্রণয়িনি জনে কিং পুনর্দুরসংস্থে ।। ৩ ।।

-[ কামনার সৃষ্টিকারী সেই মেঘের সামনে কোনও

মতে চোখের জল আটকে যক্ষ অনেকক্ষণ ভাবল।

মেঘ দেখে সুখী মানুষও উতলা হয়, গলা জড়িয়ে –

ধরা দয়িতা নারী দূর প্রবাসে থাকলে তো কথাই

নেই ]

 
আমিও মেঘ দেখে যার পর নেই উতলা ও আনন্দিত হলাম, আনন্দে জেগে- ওঠা-জাহাজের ‘ডেক’-এর উপর প্রায় দৌড়াদৌড়ি শুরু করলাম, দেখাদেখি খাজাঞ্চি হেন লোকটাও দৌড়াতে লাগল।
 
আরও অনেকেই এসে যোগ দিল, দলটা ক্রমশ ভারী হল, ততক্ষণে মদমত্ত মেঘরূপী হাতির পালও ‘হাতিডহর’ সহ সারা আকাশ ছেয়ে ফেলেছে, “নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহিরে !”
 

সত্যিই তো সুবর্ণরেখা নদী ছোটনাগপুরের পার্বত্য অঞ্চলের লোহারডেগা পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে রাঁচি জেলার নাগড়া গ্রামের কাছে হুড্রু জলপ্রপাতের সঙ্গে মিশে ঘাটশিলা হয়ে গোপীবল্লভপুর-নয়াগ্রাম-শাঁকরাইল-সোনাকনিয়া ছুঁয়ে ওড়িশার বালেশ্বরের ভিতর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে।

 
এদিক ওদিক, বিশেষত পশ্চিম দিকে,  হেথা হোথা ইতস্তত বিদ্যুতের ঝলকানি, তৎসহ মেঘগর্জন, “নিম্নে উতলা ধরণীতল”, মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে সারি সারি সাদা বকের পাল,  তারা যাচ্ছে পুব থেকে পশ্চিমে, পশ্চিমে পশ্চিমে।
 
তাই দেখে ‘হাজরী বাবু’ বলল, ‘অতবা পাহাড়-পর্বতে, নদীগোড়ায় ঝাঁপি বৃষ্টি হয়টে, রাতর বেলা  দেখব নদীজল হু-হু  করি বাঢ়েটে আর ঘুমনু উঠি দেখব ‘কাতাধার’ উছুডুবু  করেটে !’
 
সচকিত হয়ে বললাম, ‘তাহলে তো আঙ্কেল, আড়ঙঘাটার বাঁধ এখনই কাটতে হবে, এই মুহূর্তেই– ‘Don’t be worried, my son! এতক্ষণে বাঁধ আর নাই, নালায় পানি আসেটে হু-হু করি, বিশাস নাই হয় তলরু দেখি আইস।
 
ধন্যবাদ দিতেই হয় লোকটাকে বলল কি, বাঁধ আর নেই, ক্যানেল দিয়ে জল আসছে হু-হু করে, বিশ্বাস না হয় নিচে গিয়ে দেখে আসতে!
 
সত্যিই তো সুবর্ণরেখা নদী ছোটনাগপুরের পার্বত্য অঞ্চলের লোহারডেগা পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে রাঁচি জেলার নাগড়া গ্রামের কাছে হুড্রু জলপ্রপাতের সঙ্গে মিশে ঘাটশিলা হয়ে গোপীবল্লভপুর-নয়াগ্রাম-শাঁকরাইল-সোনাকনিয়া ছুঁয়ে ওড়িশার বালেশ্বরের ভিতর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে।
 
জাহাজ ‘আদজেত্তা’ অর্থাৎ ‘তাম্রলিপ্ত’ বন্দর থেকে এসে ডুবে গিয়েছিল সুবর্ণ- রেখায়। নদীর উৎসস্থল ছোটনাগপুরের পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়-পর্বতে তাই ভারী ও ভয়ানক, এখন যেমন, বৃষ্টি হলে সুবর্ণরেখায় উথালপাথাল বান ডাকবে সেটাই তো স্বাভাবিক।
 
আর  নদীতে বান ডাকলে তার অথৈ উথালপাথাল জলে ‘শরশঙ্খা’ জাহাজ যে উথলে উঠে ভেসে যাবে, সেটাও খুব সাধারণ কথা।
 
এদিকটায় এখন মেঘ-আন্ধারী, মেঘে মেঘে আকাশ ছেয়ে আছে, ‘মেঘ পুং  [ ৴ মিহ + অ ( অচ্ ) -ক, হ্ > ঘ্ ; মেঘ, কুজ্ঝটিকা ] “ধূমজ্যোতিঃসলিলমরু- তাং সন্নিপাতঃ ক্ব মেঘঃ”।
 
মেঘে মেঘে সংঘর্ষ হচ্ছে, হাতিতে হাতিতে লড়াই, ‘মেঘমেদুরিত নীলিমা’, তদুপরি বিদ্যুৎকটাক্ষ ও বজ্রপাত! বৃষ্টি শুরু হল রাতের দিকে, আর সে কী বৃষ্টি !!
 
ধুলমাদুল বৃষ্টি, ধূলাতে ঢেলাতে বৃষ্টি, অবিরলপাত বৃষ্টি, দিশাহীন বৃষ্টি, কদোপালের চর ডুবে গেল, সুবর্ণরেখা আর ডুলুঙনদী একাকার হল।
 
আমরা যারা পাতালঘরবাসী, ‘পাঠকক্ষ’-এর যাবতীয় পুস্তক ও সরস্বতীর ফটো কাঁধে-কাঁখে নিয়ে ‘জহায’-এ উঠে এলাম, কেননা সুরম্য পাতালঘরের ফাটাফুটো দিয়ে অলিতে গলিতেও গলগলিয়ে জল ঢুকছে, ঢুকছে তো ঢুকছে !
 
তার আগে মাল্লারা-দাঁড়িমাঝিরা বুদ্ধেশ্বর লায়ার আনা ওয়াটগঞ্জের মস্ত ‘লৌহঝিঁজরি’ দিয়ে ‘জহায’-কে সুবর্ণরেখানদীতটবর্তী ‘মহিষাসুর দঁক’-এর শত-পুরাতন বটবৃক্ষের সঙ্গে বেঁধে রাখল।
 
বটবৃক্ষ এক্ষণে ‘বয়া’-র কাজ করছে, কী পাহাড়-পর্বতে কী এতদ্ তল্লাটে বৃষ্টি চলছে তো চলছেই, গদগদিয়ে ঢালছে তো ঢালছেই,  টানা এই কদিন সূর্যেরও  দেখা নেই, চতুর্থ কী পঞ্চম দিনের দিন জাহাজ আচমকা তুমুলভাবে নড়ে উঠল।
 
তারমানে প্রোথিত ‘ঠেকনো’-গুলোর উপরে জল উঠে গেল, জাহাজ এখন পুরোপুরি ভাসমান, দোদুল্যমান, বটবৃক্ষের সঙ্গে ঝিঁজরির সুদৃঢ় বন্ধন থাকা সত্ত্বেও জাহাজ এপাশ ওপাশ নড়তে থাকল, দুলতে লাগল।
 
‘রৈ ঘর’ তথা রসুঁই ঘরে বসে কিছু খাবার খেতে খেতে সওদাগর ‘তপোসা’ আর ‘পালেকাথ’ দাবা খেলছিল, তাদের দুজনের মধ্যে কে যে আগে-পরে সহসা  “বাজিমাত্” বলে চিৎকার করে উঠে দুজনেই ‘ডেক’-এ দৌড়ে গেল, তা বুঝা না গেলেও সওদাগর ‘পালেকাথ’ বুঝে গিয়েছিল, জাহাজ ভাসিয়ে দেওয়ার সম্যককাল সমুপস্থিত।
 
গুণ টেনে ক্যানেলের উজান বেয়ে ‘আড়ঙঘাটা’-য় জাহাজ নিয়ে যাওয়ারও দরকার পড়বে না, এখান থেকে ভাসিয়ে দিলেই নদীর স্রোতের অনুকূলে গিয়ে প্রবল টানে জাহাজ একেবারে পড়বে গিয়ে সমুদ্রে, আর সমুদ্রে পড়ামাত্রই –
 
ডাকো বুদ্ধেশ্বর লায়াকে, এসে দিনক্ষণ ঠিক করুক সে, তবে সে এখানে আর কোথায়, সে তো থাকে সেই পোড়োগৃহে কি সংঘারামে! বাঘা বাঘা কজন মাঝি- মাল্লা এই দুর্যোগের মধ্যেও ‘ডঙা’ কী সেই ‘লাইফ-বোট’ নিয়ে তড়িঘড়ি বেরিয়ে গেল।
 
বুদ্ধেশ্বর এসে পঞ্জিকা ও অন্যান্য পুঁথিশাস্ত্রাদি ঘাঁটাঘাঁটি করে শ্লোক আউড়ে চলল  –

 
“ শুক্রাদিত্যদিনে ন বারুণদিশং

ন জ্ঞে কুজে চোত্তরাম্ ।

মন্দেন্দ্বোশ্চ দিনে ন শত্রুককুভং

যাম্যাং গুরৌ ন ব্রজেৎ ।।”

 
পশ্চিমে যাওয়া যাবে না শুক্র আর রবিবারে, উত্তরে না  বুধ আর মঙ্গলে,  পুবে না শনি আর সোমে, দক্ষিণে গমণ নাস্তি বৃহস্পতিতে।
 
খাজাঞ্চি হেন লোকটা তথা ‘হাজরী বাবু’  তথা আঙ্কেল বুদ্ধেশ্বরকে চেপে ধরল, ‘আজ ত বৃহস্পতিবার, ক্যানে অত ঘোঁট পাকাওট বাবু ? পশ্চিমে না, দক্ষিণে না, বুঝা গেলা, আমার ত উত্তরে যাইতে পারি, পুবেও !’
 
–‘কী করি ?’
 
–‘ধরো না আমারমেনে এঠিনু ক্যানেল ধরি যাইটি উত্তরে, আড়ঙঘাটায়, বৃহস্পতিতে  যাইতে মানা নাই উত্তরে, গুণ টানি চলনু আড়ঙঘাটা, সেঠিনু সিধা পুবে, বৃহস্পতিতে পুবে যাইতেও মানা কাই ?’
 
সবাই কোরাসে হ্যাঁ বলল, ‘হ্যাঁ, তাই তো !’
 
অতঃপর সাজো সাজো রব, যে যেখানে ছিল সবাইকেই তুলে আনা হল, ‘দিশাকাক’ অলম্ভুস দাঁড়কাকটা তো সঙ্গে সঙ্গেই ছিল, কখনও মাস্তুলে কখনও ‘আগাগলুই’-এ, বর্ষায় ভিজতে তার  ‘না’ নেই, কখন বা  ডানা ঝেড়ে সোজা বসল গিয়ে ‘স্টিয়ারিং রুম’-এ, তার দাঁড়ে।
 
এক্কাগাড়ি উঠল পানিতরাস তথা ‘নাব-তল’-এ, সঙ্গে উঠল মহেঞ্জোদাড়োর ছাপ্পা মারা সেই ষাঁড়, সেই ‘ডঙা’, বৃষ্টি তখনও ধুলমাদুল হয়ে চলেছে, নদীতে এখন দোতলা বাড়ির সমান মুহুর্মুহু ঢেউ উঠছে।
 
কে যেন পঞ্জিকা দেখেই বলল, আজ আষাঢ়স্য অমাবস্যা, অহোরাত্র,  অষ্টোত্তরী চন্দ্রের  ও বিংশোত্তরী রাহুর দশা, অমৃতযোগ আছে  – দিবা ঘ ১২৷৯ গতে ২৷৪৯ মধ্যে, কে আবার ? বলল তো বুদ্ধেশ্বর লায়াই!
 
সওদাগর ‘তপোসা’ আর ‘পালেকাথ’ আজ আমাকে সর্বক্ষণ চেয়ে চেয়ে দেখছে, তারা কথা কম বলছে , যখনই কিছু বলছে ওই  “ইহমেগেসিং নো সন্না ভবই, তং জহা” অং বং করেই বলছে।
 
এখন যেমন সওদাগর আমার দিকে চেয়ে বলল, “ণাণাগমো মচ্চুমুহস্স অত্থি  ইচ্ছাপণীষা বংকাণিকেষা।…”

 
[ মৃত্যুর মুখের বহু দ্বার আছে, তবুও কিছু

মানুষ ইচ্ছার দ্বারা পরিচালিত হয়ে

বক্রতা বা মায়ার নিকেতনে বাস করে…” ]

 
এর বাস্তবিকই অর্থ  আমি তো কিছুই বুঝছি না। তবু কথায় কোথাও যেন একটা  মায়া রয়ে যাচ্ছে!
 
মেঘবারিপাত এখনও থামেনি, মেঘ যেন ভাঙা ভাঙা হয়ে জলবৃষ্টি করেই চলেছে, করেই চলেছে, থামবার কোনও পূর্বাভাস নেই, অথচ দিবা ঘ ১২৷৯ গতে ২৷৪৯ মধ্যে তারা যাত্রা শুরু করবে।
 
‘দিশাকাক’ আর বৃষ্টিতে না ভিজে দাঁড়ে বসে গেছে, ‘পাছাগলুই’-এ কাণ্ডারি, ‘স্টেশন গ্যালারি’-তে ‘আড়কাঠি’, কী যেন একটা কৌটোর মধ্যে কাঠি গুঁজে উপর্যুপরি খুড়ুর মুড়ুর করে চলেছে, করেই চলেছে।
 
অনুকূল হাওয়া চালাচ্ছে, এই বৃষ্টির মধ্যেই মাঝিমাল্লারা চার-চারটে মাস্তুলের  খুঁটে পাল বা ‘বাতবস্ত্র’-এর দড়ি বাঁধছে, তার মধ্যেই গানও হচ্ছে –

 
“ দে খুলে দে, পাল তুলে দে

যা হয় হবে, বাঁচি মরি ।।”

 
দাঁড়িরা,  একশত দাঁড়, এদিক ওদিক পঞ্চাশ পঞ্চাশ করে যে যার আসনে বসে গিয়েছে, ‘কোরা’ দড়িতে বাঁধা দাঁড়টা জলে চুবিয়ে নেড়েচেড়ে দেখছে, জুতসই হচ্ছে কীনা।
 
মেয়েরা, হলবলি রমণীরা এখনও এই ডেক সেই ডেক ওঠানামা দৌড়াদৌড়ি করে ধুপ ধাপ আওয়াজ করছে, আচমকা বৃষ্টি থেমে গিয়েছে, কেউ কেউ বলছে, আর জল হবে না।
 
খাজাঞ্চি হেন লোকটা জোর দিয়ে বলল, ‘নদী অখনও ছিঁড়েনি, আবার ঝড়িয়া-বরষা হিবে, আলবৎ হিবে,  জলে ফেনা দেখায়টে, পিঁপড়া ডিম নি করি উপর-মুহা যায়টে, কী বুঝল ?’
 
সওদাগর ‘পালেকাথ’ স্টেশন গ্যালারিতে ‘স্টিয়ারিং’-এ বসল, তার আগে সিঁড়ি নামিয়ে আমাদের ‘মহিষাসুর দঁক’-এর বৃহৎ বটের গোড়ায় নামিয়ে দেওয়া হল, আমার সঙ্গে নামল কতিপয় রমণীও, ‘শিরিন’ ‘ক্লিওপেট্রা’ তো নামলই, আর নামল ‘ফুলটুসি’ আর ‘ফুলকলি’।
 
জাহাজের ‘আগাগলুই’-এ দাঁড়িয়ে সওদাগর ‘তপোসা’ একটা হরিদ্রা বর্ণের নিশান উড়িয়ে ‘জহায’ খুলে দিতে বলল। অমনি বটবৃক্ষ তথা ‘বয়া’-য় পেঁচানো লোহার ঝিজরি খুলে সিঁড়ি দিয়ে তর্ তর্ করে উঠে সিঁড়ি তুলে নিল মাল্লাটা।
 
জাহাজ ‘মহিষাসুর দঁক’ ছেড়ে কাটা-খাল বরাবর আড়ংঘাটা পেরিয়ে ভরা  নদীতে পড়ল, ডেকের উপর দাঁড়িয়ে সওদাগর ‘তপোসা’, খাজাঞ্চি হেন লোকটা, অন্যান্য মাঝিমাল্লারা ঘন ঘন উপর্যুপরি হাত নাড়তে লাগল।
 
প্রত্যুত্তরে আমিও দু হাত তুলে হাত নাড়াচ্ছি, অনন্তর কয়েক মুহূর্তও কাটল না, সুবর্ণরেখা নদীর আষাঢ়স্য এক মহাপ্লাবনে উত্থিত উথালপাথাল ঢেউয়ে আন্দোলিত হতে হতে ‘শরশঙ্খা’ জাহাজটা চোখের আড়ালে চলে গেল।
 
এতক্ষণে ‘দাঁড়’ থেকে বেরিয়ে ‘দিশাকাক’ অলম্ভুস দাঁড়কাকটা জাহাজের আগে আগে মাথার উপর উড়ে চলেছে, তাকে এখন একফোঁটা বিন্দুর মতো দেখতে পাচ্ছিলাম,  তাও একসময় হারিয়ে গেল, এতদিন ধরে তিল তিল করে গড়ে ওঠা গোটা ছবিটাই মুছে গেল !
 
সম্বিত ফিরে পেয়ে পিছন ঘুরে দেখি, আমার সঙ্গে যারা এসেছিল,  ‘শিরিন’ ‘ক্লিওপেট্রা’ ‘ফুলটুসি’ ‘ফুলকলি’, তারা কোথায় গেল ? তাদের কেন দেখতে পাচ্ছি না ?
 
বৃষ্টি সত্যি সত্যিই হয়েছিল, এখনও হচ্ছে, হয়েই চলেছে। দেখতে পাচ্ছি জলের কিনারায় খুঁটে খাচ্ছে কয়েকটা জলপিপি, কাদাখোঁচা, আর ডাহুক ।।

 

♦–•– সমাপ্ত –•–♦

 
আগের পর্ব পড়ুন: পর্ব ১২

ঝাঁ ঝাঁ রৌদ্রে অথবা ফিঙ-ফোটা-জ্যোৎস্নায়। পর্ব ১২


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!