- গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
- মার্চ ২৪, ২০২৪
রাতের বালিশ
অলঙ্করণ: দেব সরকার
সকালে ঘুম ভেঙ্গে উঠে থেকে শরীরটা কেমন যেন লাগছে। অর্ঘ্যকমল দাঁত মাজতে মাজতে টের পেল হাতের কব্জিদুটো ব্যথা করছে ! আস্তে আস্তে গত রাতের কথা মনে পড়ল তার। প্রায় সমস্ত রাত কারা যেন তার হাত দুটি বেঁধে রেখেছিল। ছটফট করেও খুলতে পারেনি। রাতের স্বপ্নের পরিশ্রমে দিনের বেলা শরীর ক্লান্ত ! নাঃ, অফিসে বেরোতে গিয়েই দেখা গেল, যেমনটি আন্দাজ করা গিয়েছিল তাই বটে। হ্যাঁ, নতুন কেনা বাইক চালাতে গিয়ে পাড়ার মধ্যে দু-দুবার পড়ে হাতে ব্যথা পেল। দুষ্টু ছেলের দল তাই এর মধ্যেই বার দুয়েক রাতবিরেতে টায়ার পাংচার করে দিয়ে পালিয়েছে।
নিজের এই অসহায় হাত-পা-বাঁধা অবস্থাটা নিয়েই আজকাল একটু অসুবিধেয় আছে অর্ঘ্যকমল। সরকারি অফিসে ছোটখাটো একটি চাকরি করলেও একসময় সে মনস্তত্বের কিছু বই পড়তে উৎসুক হয়েছিল। স্বপ্ন সম্বন্ধেও অনেক অদ্ভুত কথা জানতে পেরেছিল সে। আসলে বইগুলো ছিল ছোটদাদুর। বাবার বাবা-মা’কে তো দেখেনি, তবে বাবার ছোটকাকা অনেকদিন বেঁচে ছিলেন। অর্ঘ্যকমলকে স্নেহ করতেন খুব। অত্যন্ত জ্ঞানী, সত্যবাদী, ঋজু চরিত্রের লোক ছিলেন তিনি ।
“কদাপি মিথ্যার আশ্রয় নিবা না দাদুভাই । যতই ঢাকা দিয়া রাখো, পুঁজ ভরা ফোঁড়ার মত মিথ্যা ঠিক মাথা গজাইয়া বাইরইয়া আসব। বরং, সত্য কথা কইয়া, সত্যের পথে চইলা অনেক শান্তি পাইবা ।”
সেই ছোটদাদুর আলমারি থেকেই বইগুলো হাতিয়েছিল এগারো ক্লাসের অর্ঘ্যকমল। বিশেষ করে প্যারাসাইকোলজি, অতীন্দ্রিয় উপলব্ধি, আলোকদর্শন ও স্বপ্নের ফলাফল সম্বন্ধে পড়তে বেশ লেগেছিল তার । ছোটদাদু তখন বয়েস-জনিত রোগে প্রায় শয্যাশায়ী ।
স্বপ্নে জল শেষ হয়ে গেলে ভয়ঙ্কর রকমের অস্থিরতা। গোঙানি শুনে জ্যাঠাইমা তাকে ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে দেন বটে। কিন্তু আবার ঘুমিয়ে পড়ার কিছুক্ষণের মধ্যে একই ব্যাপার।
কলেজ কামাই করে দাদুর তক্তপোশের পাশেই বসে ছিল সারাদিন। মন ভালো ছিলনা তার। এক দৃষ্টিতে অসুস্থ মানুষটার মুখের দিকে দেখছিল। হঠাৎই তিনি চোখ খুলে অল্প উঠে বসার চেষ্টা করলেন যেন। তারপর ঝুঁকে পড়া অর্ঘ্যকমলের মুখখানা মন দিয়ে দেখতে দেখতে ঠিক তার দুই ভুরুর মধ্যেখানে ডান হাতের তর্জনীটি ছুঁয়ে দিলেন। আচমকা বাজ পড়লে যেমন মুহূর্তের জন্য চোখ ধাঁধিয়ে যায়, কানেও কিছু শুনতে পায়না, তারও ঠিক সেই রকম একটা অনুভূতি হোল। তারপর হুঁশ ফিরতে দেখল দাদুর বুকের ওঠানামাটা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। চেঁচিয়ে সবাইকে ডাকতে, গঙ্গাজলের খোঁজ, হইচই, কান্নাকাটি শুরু। এর মধ্যেও শরীরের অল্প ঝিমঝিম ভাবটা অর্ঘ্যকমল টের পেয়ে উঠে গিয়েছিল। তার ঠিক একমাস পর থেকেই তো সে ব্যাপারটা উপলব্ধি করল।
জ্যাঠতুতো দিদি রাতের পর রাত ঘুমোতে পারছে না। এদিকে তার বিয়ের তারিখ এগিয়ে আসছে । চোখের তলায় পুরু কালি । আজকাল সে সমস্ত রাত হাত ধোয়ার স্বপ্ন দেখে কাটায় ! ধুতে ধুতে আবার স্বপ্নে কলের জল শেষ হয়ে গেলে ভয়ঙ্কর রকমের অস্থিরতা। গোঙানি শুনে জ্যাঠাইমা তাকে ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে দেন বটে। কিন্তু আবার ঘুমিয়ে পড়ার কিছুক্ষণের মধ্যে একই ব্যাপার। মিলিদিদি আর অর্ঘ্য ছোট থেকে চিলেকোঠার বৈয়মের আমকাসুন্দী ভাগাভাগি করে খেয়েছে। এছাড়া ছোটবেলায় দিদি রান্নাবাটির থালায় তরকারির খোসা, ধুলোবালির যে কোন অন্ন পরিবেশন করলে, ভাই আসনপিড়ি হয়ে বসে, মুখ দিয়ে চকচক শব্দাবলী নির্গত করে খাবার ভান করেছে। তারপর ছোট ঢেঁকুর তুলে, “আঃ, কি ভালো, দিদিভাই” বলে খুশিতে মন ভরিয়ে দিয়েছে মিলি’র।
প্রিয় দিদির এমন অবস্থা দেখে ভাইয়ের মন খারাপ হবেই। ততদিনে সে পড়ে ফেলেছে, পৃথিবীর চৌম্বক-ক্ষেত্র’র সাথে মানুষের স্বপ্নের সম্পর্ক কি, ঘুমের প্রথম এক-দেড় ঘন্টা কিভাবে র্যাপিড-আই-মুভমেন্ট স্লিপের প্রভাবে স্বপ্ন আসে, গ্যালান্টামিন নামের ওষুধ দিয়ে কিভাবে মানুষকে স্বপ্ন দেখানো যায়, এমনকি ঘুমোনোর আগে কি ধরনের চিন্তা করলে কেমনতর স্বপ্ন হাজির হতে পারে। ছোটদাদুর বইগুলোর মধ্যে এছাড়াও একটা অমূল্য জিনিস সে পেয়েছিল। সেকথা কাউকে কোনদিন বলেনি। কাঁপা হাতের লেখায় কাগজে লিখে গেছেন স্বপ্ন’দের অর্থ, কেন বিভিন্ন স্বপ্ন বারবার দেখে মানুষ। আর একবার এ সব পুঁথিপত্র দেখেশুনে অর্ঘ্য মিলিদিদির কাছে গেল।
“মন খুলে বলে ফ্যাল দিদিভাই, কি অন্যায় করেছিস। আমি কাউকে বলব না কিন্তু আমায় বলে হালকা হলে তোর স্বপ্নগুলো জ্বালাতন করা বন্ধ করবে,” মিলিকে বলে অর্ঘ্য।
প্রত্যুত্তরে ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলে মিলি।
“আচ্ছা, তুইই বল ভাই, ক্লাসের তিন্নী’র চেয়ে আমি একটু হলেও বেশি ফর্সা না ? পুরো দেড়-ইঞ্চি লম্বাও বটে। তাহলে ওর পাকাদেখা কেন আগে হয়ে গেল ! না হয় ওকে সবাই গানের গলার জন্য প্রশংসা করে, সেলাইয়ের হাতটাও মন্দ না । কিন্তু আমিও কি লং-জাম্পে বরাবর প্রাইজ পেয়ে আসিনি ? আমার মত এক দমে ডুবসাঁতারে পাকড়াশিদের পুকুর পার করতে কেউ পারে এ পাড়ায় ? খুব রাগ হয়েছিল। তাই আমি ওদের বাড়ি গিয়ে ওর পোষা টিয়াটা খাঁচা থেকে উড়িয়ে দিয়ে পালিয়ে এসেছিলাম । কাজটা ভালো করিনি জানি, কিন্তু কি করে জানব লাগাতার স্বপ্নের ভেতর হাত ধোয়াধুয়ি শুরু হয়ে যাবে !
বলা বাহুল্য মিলির স্বপ্নবিভ্রাট সেখানেই শেষ হয়েছিল। পরের মাসেই সুন্দরী রাঙা-বৌ সেজে শ্বশুরবাড়ি গিয়েছিল সে।
****
এ তো গেল মিলি’র মুস্কিল-আসান হওয়ার কথা । কিন্তু তারপর থেকে কত অজস্রবার যে রাতের স্বপ্ন দেখে ধড়মড় করে উঠে বসে থাকত অর্ঘ্য । সেইসব রাতের পরদিন সকালে, ক্লাসের রেজাল্টে খারাপ নম্বর পাওয়া, বাড়ি ফিরে বকুনি খাওয়া অবধারিত।
পাড়ার বিজনদা’র ব্যাপারটা তো নিজেকেই তাক লাগিয়ে দিল। বিজনদা খুব ভালো স্টুডেন্ট। দুর্দান্ত সেতার বাজায়। এম-এ পাশ করে শিগগিরি চাকরিতে ঢুকবে। পুত্র গর্বে তার বাবা-মা সর্বদাই ডগমগ। ছোট থেকেই বিজনদাকে রাস্তায় দেখলে একধারে সরে দাঁড়ায় অর্ঘ্যকমল।
ওপরের দিকে দুই হাত বাড়িয়ে ছাত-টাত ফুঁড়ে ধাঁ ! স্বপ্নের মধ্যে অর্ঘ্যকমল ছুটে ছুটে বাইরের রাস্তায় পৌঁছয়। মাথা তুলে ওপরে দেখতে চেষ্টা করে। সেই যে মেঘের ওপর মিলিয়ে গেল বিজনদা, আর দেখাই গেল না ! সেই বিজনদা চাকরি পেয়ে কলকাতা থেকে সিমলা যাওয়ার পর দিনে দিনে তার ফোন, চিঠি আসা কমতে কমতে একদিন বন্ধ হয়ে গেল
“দ্যাখ্, দেখে শেখ্ ! রত্নগর্ভা বটে সান্যালবৌদি । এ ছেলে বড় হয়ে কেউকেটা হবে একজন,” অর্ঘ্য’র জেঠিমা বলতেন বরাবর।
কিন্তু সেই বিজনদা’কে নিয়ে অর্ঘ্যকমল স্বপ্ন দেখতে শুরু করল। কি আজব ব্যাপার ! বিজন’দা পার্কে মর্নিং-ওয়াক করছে । হাঁটতে হাঁটতেই হুস-স্ ! আকাশে উড়ে গেল ডানা ছাড়াই ! আবার একদিন বিজনদা সেতার নিয়ে বসেছে । অর্ঘ্যকমল তাদের একতলার ঘরের জানলার গরাদে মুখ রেখে শুনছে। হঠাৎ মানুষটা সেতারটা রেখে উঠে দাঁড়াল। তারপর বলা নেই, কওয়া নেই, ওপরের দিকে দুই হাত বাড়িয়ে ছাত-টাত ফুঁড়ে ধাঁ ! স্বপ্নের মধ্যে অর্ঘ্যকমল ছুটে ছুটে বাইরের রাস্তায় পৌঁছয়। মাথা তুলে ওপরে দেখতে চেষ্টা করে। সেই যে মেঘের ওপর মিলিয়ে গেল বিজনদা, আর দেখাই গেল না ! সেই বিজনদা চাকরি পেয়ে কলকাতা থেকে সিমলা যাওয়ার পর দিনে দিনে তার ফোন, চিঠি আসা কমতে কমতে একদিন বন্ধ হয়ে গেল। ছেলেকে খুঁজতে বাবা-মা চাকরির জায়গায় হাজির হয়ে এক অদ্ভুত কথা শুনলেন। জামাকাপড়, জিনিসপত্র সব রেখে দিয়ে বিজন এক রাতে চৌকিদারের হাতে হাজার টাকা দিয়ে, তাকে বলেছে, “চলতা হু। মুঝে বহুত রাস্তা চলনা বাকি হ্যায়।”
সেই যে সে গেছে, সহকর্মী, আত্মীয়, সংসারের আর কারও সাথেই কোন যোগাযোগ রাখেনি। চৌকিদার অবশ্য বাবুর গলায় রুদ্রাক্ষের মালাটা লক্ষ করেছিল।
নিজের স্বপ্নকে নিজেই এক এক সময়ে ভয় পেতে শুরু করল অর্ঘ্যকমল। কিন্তু এক এক সময়ে সে খুশিও হয়েছে বটে। অফিসের রাতুল কাজে এসে প্রায় প্রত্যেকদিনই বলতে শুরু করল, “রাতে বিচ্ছিরি রকম কান্ড, দাদা । কদিন পরপরই স্বপ্নে বাড়ির মধ্যে নতুন নতুন ঘরের দরজা খুলে ঢুকছি ! আশ্চর্য ব্যাপার ! সে সব ঘর আমাদের বাড়িতে নেইই ! আমি জীবনে দেখিনি সে সব জায়গা !”
“চিন্তা কোর না ভাই। তোমার সার্ভিসের বেশ কয়েক বছর হোল তো। মাঝে পরীক্ষা-টরীক্ষাও কি সব দিয়েছ। অপেক্ষা কর। নতুন সুযোগ আসলেও আসতে পারে,” মনমরা রাতুলকে কি ভেবে বলে দিল অর্ঘ্যকমল ।
পরের মাসে সত্যিই রাতুলের দুবাই থেকে চাকরির ডাক এল। ইঞ্জিনিয়ারিং’এর ডিগ্রিটা বিশেষ কাজ দিচ্ছিল না বলে প্রাইভেটে ম্যানেজমেন্ট পড়ে নিয়েছিল বছরখানেক সে। ব্যাঙ্কের চাকরিতে চান্স পাবে সে কথা কি কখনও ভেবেছে ! রাতুল অফিসের সেকশনের সবাইকে বিরিয়ানি খাইয়ে দিল একদিন । আর অর্ঘ্যকমলের পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে গেলে রাতুলকে ঠেলেঠুলে দাঁড় করিয়ে নিজে তাড়াতাড়ি টয়লেটে পালাল ।
****
যেটুকুই তার ক্ষমতা, বা অক্ষমতা হোক, সে ব্যাপারে অন্য কেউ মাথা ঘামাক বা আলোচনা করুক তা অর্ঘ্যকমল কোনমতেই চায়না। কিছু অসাধু লোকজনেও তো তাকে ব্যবহার করতে তৎপর হতে পারে । সে সবসময়ে নিজেকে কিছুটা গুটিয়ে রেখেছে । বড় হলেও অন্তর্মুখী স্বভাব খুব একটা বদলায়নি । এই কারণে জ্যাঠা-জেঠিমা তাকে বিয়ে দিতে পারলেন না, হাল ছেড়ে দিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন দুজনেই। বাবা-মা তো কবেই মারা গিয়েছেন । সহোদর ভাইবোন না থাকায় এ ব্যাপারটা নিয়ে জোরাজুরি করার ভাগ্যিস কেউ আর নেই। পৈত্রিক তিন-পুরুষের বাড়ি সামলে গুছিয়ে বসার মনের বা ট্যাঁকের জোর অর্ঘ্যকমলের কোনটাই ছিলনা। তাই জ্যাঠতুতো দাদা-বউদির হাতে সে সব ঝামেলা ছেড়ে দিয়ে বড় বাড়ি থেকে একটু দূরে, মনের সুখে একটি এক কামরার ফ্ল্যাটে বাস করে।
এ ব্যবস্থায় দাদা-বউদি অবশ্য যথেষ্ট খুশি। তবে মেয়েটিকে বিয়ে দিয়েও একমাত্র ছেলেটিকে নিয়ে তাদের চিন্তার শেষ নেই। টুনাই ছোট থেকে এতটা অসুস্থ ছিলনা। বছর একুশ থেকে ছেলেটার কি যে হোল। আস্তে আস্তে হাত, কিছুদিন পর পা দুটো শক্তি হারিয়ে ফেলল। গত চার-পাঁচ বছরে সেগুলো শুকিয়ে সরু হয়ে এসেছে। ছেলেটার হুইল-চেয়ারে আশ্রয় নিতে হয়েছে। ভাইপোকে ভালোবাসে অর্ঘ্যকমল। জ্যাঠতুতো দাদা, উমেশ, নানা জায়গায় খবর নিয়ে, ওষুধপথ্য করে যখন ছেলের স্বাস্থ্যের ক্রমাগত অধঃপতন আটকাতে পারছিলেন না, তখন তাকে কলকাতায় নিয়ে গেলেন। এক বন্ধুই যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিল প্রখ্যাত স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ সামন্ত’র সাথে। টুনাইয়ের মোটামুটি ভালো হয়ে উঠতে বেশ কিছুটা সময় লাগবে ডাক্তার সে কথা বলে দিয়েছেন। শহরের উপকন্ঠে বাস করে চিকিৎসা ঠিকমত চালিয়ে যাওয়া, অসুস্থ ছেলেকে নিয়ে বারবার দৌড়োদৌড়ি করা যথেষ্ট মুশকিল। দাদা-বউদি কলকাতায় হাসপাতালের কাছাকাছি একটি ছোট ফ্ল্যাট ভাড়া নিলেন। সেখানে থেকে টুনাইয়ের চিকিৎসা করা অনেকটা সহজ হবে। তবে উমেশ অবসরপ্রাপ্ত মানুষ। ছেলের জন্য খরচা আছে। টাকাপয়সার ব্যবস্থা করার জন্য পুরনো বাড়িটি একটু সারাই করিয়ে এক ভাড়াটের হাতে দিলেন। তারা এসেছেন উত্তরপ্রেদেশ থেকে। পাটের ব্যবসা, খুব ভালো রোজগার। কলকাতা থেকে অল্প দূরে নিরিবিলি জায়গায়, একটু বড় খোলামেলা বাসস্থান খুঁজছিলেন। কপালে তিলক পরা মিস্টার বাজোরিয়া আর তার গোলগাল গিন্নী প্রথম দর্শনেই বলেছিলেন, “বাড়ি নিয়ে কুছু চিন্তা করবেন না ঘোষালবাবু। আপনার ঘরবাড়িকে হামি নিজের মত করেই দেখব। যতন করে রাখব।”
দিব্যি ব্যাপার। মাসে মাসে গোটা বাড়ির ভাড়ায় দাদার কলকাতার ফ্ল্যাটের ভাড়া কুলিয়ে যায়। খাওয়াদাওয়া আর টুনাইয়ের ওষুধবিষুধের খরচাপাতিও উঠে আসে কিছুটা। দাদার অনুরোধে অর্ঘ্যকমলের মাঝেমধ্যে ও বাড়িতে তার যাওয়া-আসা করতে মন্দ লাগে না। মিস্টার বাজোরিয়া গল্পের ঝুড়ি খুলে বসতে ভালোবাসেন। বেশ বড়সড় গ্লাসে ঠান্ডা শরবত বানিয়ে টেবিলে সাজিয়ে দেন তার গিন্নী— “মুন্না সুবহ কাম মে নিকল যাতা, শাম কো লউটতা। সমঝে না? কেয়া করে, ইয়েহি তো টেইম হ্যায় দো পেইসা কামানে কা।” বাপ পুত্রগর্বে আনন্দিত।
মাস আটেক কেটে যায়। প্রতি মাসে ভাড়ার টাকাটা অর্ঘ্যকমলই নিয়ে এসে দাদাকে দেয়।হঠাৎ করেই এক মাসে ভাড়াটা দিলেন না বাজোরিয়া। “আরে, কুছ মহিনা মে লছমী মাতা পকড়ে নহি যাতি, কেয়া করে। মগর আপ লোগ কিরায়া কা চিন্তা নহি করনা! ইতনে দিন মে কভি কোই প্রবলেম হুয়া কেয়া !” ভদ্রলোকের হেঁ-হেঁ হাসিতে খুব একটা আশ্বস্ত না বোধ করলেও মুখচোরা অর্ঘ্যকমল আর বিশেষ কিছু না বলে ফিরে আসে।
তারপর টানা দু-তিন মাস এভাবেই কেটে যায়। নিজের মাইনে থেকে দাদাকে সাহায্য পাঠালেও দুশ্চিন্তায় ভোগে দুই ভাই-ই। মাঝে একবারের জন্যও বাড়ি-ঘর দেখতে আসা হয়নি উমেশবাবুর। এক রবিবার হন্তদন্ত হয়ে হাজির হলেন। বেশ বিরক্ত হয়ে ভাইকে বকলেন, “তোর না কোন বিষয়-বুদ্ধি হোল না, ভালো করে দুটো কথা বলতে পারিস। মিলি আর ওর জামাই এ বাড়ির অংশ চায় না। তাই ওদের এসব ব্যাপারে টানতেও চাইনা আমি। তুই বরাবর দায়িত্ব এড়িয়ে নিজের এই এক-কামরার ফ্ল্যাটেই থাকলি। পৈত্রিক সম্পত্তিটা তাহলে আমারই ভোগ করতে হবে ! অথচ সামান্য ভাড়ার টাকাটা তোকে দিয়ে কিনা উদ্ধার হচ্ছে না! আমি টুনাইকে নিয়ে ব্যস্ত থাকব না ভাড়া আদায় করতে বারবার আসব, বল তো?” বললেন উমেশ।
অর্থকষ্ট সবাইকেই ঝামেলায় ফেলে। দাদার মন উতলা, মাথার ঠিক নেই। দুই ভাইয়ে একদিন হাজির হল বাজোরিয়ার কাছে। বাড়ির সামনের গেটে তেনারা নিজেদের নামের ফলক লাগিয়েছেন ! বড় গেটের ওপর ফুলে ভরা মাধবীলতাটার হদিস পাওয়া গেলনা ! “বড্ড পোকামাকড় হোতা থা, তো কাট কর হটা দেনে পড়া,” নির্বিবাদী মুখে বলে দিলেন বাজোরিয়া গিন্নী।
এবার আসল কথা শুরু হতে ঘরে প্রবেশ করল সানি বাজোরিয়া। ছ’ফিটের বেশী লম্বা, পেটানো স্বাস্থ্য দেখে একটু হকচকিয়ে গেলেও বকেয়া ভাড়ার কথা তুললেন উমেশবাবু। ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে দেখলেন অর্ঘ্যকমলও মাথা নেড়ে সায় দিয়ে চলেছে।
“বোলেন কি ঘোষালবাবু ! আপনাদের কি ইয়ার্দাশ কমতি হয়ে যাচ্ছে ! ভাড়া আবার বাকি কোথায়? সে তো কলকাতায় চলে যাওয়ার আগে আপনিই হরবরানি করে রিসিপ্ট ওয়াগারা’র ব্যাবস্থা করতে চাইলেন না। ক্যাশে প্রত্যেক মাসে এই অর্ঘ্যকমল বাবু টাকা নিয়ে যাননি আমার ড্যাডি’র থেকে ! যান যান। ই সব ফালতু ঝঞ্ঝাট নিয়ে আর আসবেন না ইখানে,” টনি’র আস্ফালনে ছোটভাইয়ের মুখের দিকে হাঁ করে তাকান উমেশ।
‘তবে যে তুই বলছিলি…” আমতা আমতা করেন তিনি।
****
দুইভাই মাথা নীচু করে অর্ঘ্যকমলে’র ছোট্ট বাসায় ফিরে আসে। উমেশ রাতে কিছু খেতে চান না। পীড়াপিড়ি করলে বলে ওঠেন “কি করে বুঝব, ভাই হয়ে ভাড়ার টাকা মারতে শুরু করে দিবি তুই ! তোর থেকে আমি এমন আশা করিনি !’ দু-হাতের মধ্যে মুখ রেখে কেঁদে ফেলেন উমেশ।
দাদার চুল অনেকটা পেকে গেছে। কুঁজো হয়ে গেছে মানুষটা। সন্তান বড় হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংসারের হাল ধরবে তাঁর এমন আশাও আর কই। এর মধ্যে এমন বিপদ কিনা দুই ভাইয়ের মধ্যে অবিশ্বাসের দেওয়াল তুলে দেবে ! অর্ঘ্যকমল সেদিন সারারাত বারান্দায় জেগে বসে কাটায়। ছোটদাদু’র কথা মনে পড়ে বারবার। সত্য আবিস্কার করতে ন্যায়ের পথ আশ্রয় করে কিভাবে এগোতে হবে? ভাবতে ভাবতে সে নাজেহাল হয়।
কোর্টে কেস করা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। জ্ঞাতি-পড়শি সবাই তাই বলে। ভাগ্যিস জেঠিমার বেশ কিছু গয়না বৌদির কাছে সযত্নে রাখা ছিল। কেস’এর তোড়জোড় শুরু হয়। প্রতিটি তারিখে খরচা বাড়তে থাকে। বাজোরিয়া’রা ফোন করলে আর কথা বলেনা। দেখা করতে গেলে গেটের মুখে গুঁফো দরোয়ান বলে দেয় ভেতরে যাওয়া মানা।
অর্ঘ্যকমলের অস্থিরতা বাড়ে। মামলা জেতার আশা নয়, তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে আজকাল এক অজানা আশঙ্কা। রাতে অদ্ভুত সব স্বপ্ন দেখে সে। বেশীর ভাগেরই আর কোন অর্থ বুঝে উঠতে পারেনা। দিনরাত তার চোখের সামনে ভাসে টনি বাজোরিয়ার হিংস্র মুখ। লোকটা সেদিন বড় বড় পা ফেলে কিরকম যেন শ্বাপদের মত হেঁটে বেড়াচ্ছিল বসার ঘরে। পরোক্ষে তাদেরকে দায়ী করতে করতেও চোখে চোখ রেখে একেবারে নির্লজ্জের মত কথাগুলো বলছিল লোকটা। পায়ের ওপর পা তুলে নাচাচ্ছিল তার বাপ। ইদানীং টনি’র জোরালো গলার আস্ফালন, অপমান করার ভঙ্গিটাও যেন কেমন নিজেরই রন্ধ্রে রন্ধ্রে টের পায় অর্ঘ্যকমল! সর্বক্ষণ ওই লোকটার কথা ভাবতে ভাবতে নিজেই তেমনটি হয়ে যাচ্ছে নাকি সে!
টনি বাজোরিয়ার কথা ভাবতে ভাবতে অফিসের কাগজে একদিন নিজের সইয়ের বদলে তার নাম লিখে ফেলল অর্ঘ্যকমল। “কি ব্যাপার মিস্টার ঘোষাল। এরকম আজব ভুল করতে শুরু করলে তো মহা মুশকিল ! কিছুদিন হোল আপনাকে খুব অস্থির দেখছি। চান তো মশাই কদিন ছুটি নিয়ে রেস্ট করুন বাড়িতে। আপনার কাজ সামলিয়ে নেব অন্য কাউকে দিয়ে,” বড়বাবু শুনিয়ে দিলেন একদিন।
অজানা ছায়াসঙ্গীদের সাথে সে প্রেতপুরীর মত আধো অন্ধকার একটা ঘরে কাগজ ঘাঁটছে। বান্ডিল বান্ডিল কাগজ ! মোটা মোটা, শক্তপোক্ত কাগজ ! আর সেই একই সময় নানা কন্ঠস্বর, কানের কাছে ঘ্যানঘেনে সুরে, অসংখ্য মন্ত্রণা উচ্চারণ করেছে
সর্বনাশ, চাকরি নিয়ে টানাটানি হলে তো এখন সমূহ বিপদ। একা একা ঘরে বসে মাথায় হাত দিয়ে ভাবে অর্ঘ্যকমল। দাদা কলকাতায় ফিরে গেছে। টুনাইয়ের ট্রিটমেন্টে এসময়ে গাফিলতি হলে ফল খুব খারাপ হবে। কোর্টের পরের শুনানি’র তারিখ এসেছে। কিন্তু এদিকে অর্ঘ্য’র ভেতর অদ্ভুত উত্তেজনা ক্রমাগত বাড়ছে।
ইদানিং অফিসের সামনে বসে থাকা বুড়ো ভিখারিটাকে খুচরো পয়সাগুলো দিতেও তার আর ইচ্ছে করেনা। একদিন পেছন ডেকেছিল বলে কি যাচ্ছেতাই ভাবে বকে দিল অর্ঘ্যকমল। বহু বছর ধরে সরকার মশাইয়ের দোকান থেকে বিল্টু মাসকাবারি, টুকিটাকি জিনিস দিয়ে যায়। “এখন হবেনা। যা বলছি ! প্রত্যেক মাসেই তো নগদ দিয়ে দিই। এ মাসে আমার যখন ইচ্ছে হবে তখনই ডেকে টাকা দিয়ে দেব। বলে দে গিয়ে তোর মালিককে।” অর্ঘ্য’র ব্যবহার দেখে বিল্টু অবাক হয়ে ফিরে যায়।
অর্ঘ্য’র মগজে দিনরাত্তির ওলট-পালট। এক অচেনা শয়তানি চিন্তা-তরঙ্গ তার মস্তিস্কের ওপর ক্রমাগত প্রতিপত্তি ফলাচ্ছে ! তিন-চারদিন ছুটি নিয়েও দেখেছে অর্ঘ্যকমল। কখন সকাল হয়, বিকেল পেরিয়ে রাতই বা কখন হোল, হিসেব রাখতে পারছেনা এখন। ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়ে ছোট তক্তপোশে। আর হাজারটা দৃশ্যপট ভেসে যেতে থাকে তার মাথার ভেতর। একরাতে সে ধড়মড় করে উঠে বসে। সারা শরীর ভেসে যাচ্ছে ঘামে। সারারাত সে অজানা ছায়াসঙ্গীদের সাথে প্রেতপুরীর মত আধো অন্ধকার একটা ঘরে কাগজ ঘেঁটেছে। কাগজ ! হ্যাঁ, কাগজই তো ! বান্ডিল বান্ডিল কাগজ ! মোটা মোটা, শক্তপোক্ত কাগজ ! আর সেই একই সময় নানা কন্ঠস্বর, কানের কাছে ঘ্যানঘেনে সুরে, অসংখ্য মন্ত্রণা উচ্চারণ করেছে।
দাদার ফোন এলো, কোর্টে আজ একেবারে সময় মত পৌঁছতে হবে। বাজোরিয়ার পক্ষের ধূর্ত উকিল অপরপক্ষের সাক্ষীকে দিয়ে নানারকম কথা বলিয়ে নিতে ওস্তাদ। সে যেন মাথা ঠান্ডা রাখে। বেফাঁস কিছু বলে ফেললে কেস জেতার কোনই আশা থাকবে না।
কিন্তু কোন্ কেস ! কি জিতবে তারা দুই ভাই ! প্রতারণার আড়ালে আরও ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র ধীরে ধীরে রূপ ধারণ করেছে, অর্ঘ্যকমল যে তার কদাকার চেহারা দেখতে পাচ্ছে মনশ্চক্ষে ! কোর্টে সে পৌঁছল সঠিক সময়েই। তাকে বিরোধী পক্ষের উকিল কাঠগড়ায় দাঁড় করাতেই কথা বলতে শুরু করল অর্ঘ্যকমল। তার কথা শুনতে শুনতে হতবাক হয়ে যাচ্ছে উমেশ, দুই পক্ষের উকিল, এমনকি বিচারক নিজেও।
“এ এক সাজানো বিচারের সিন, ধর্মাবতার। এই কেস জেতার সম্ভাবনা আমাদের এতটুকুও নেই, যদি না সত্যিটা উদ্ধার করা হয়। বিরাট বড় ষড়যন্ত্র করেছে বাজোরিয়া’রা। তার প্রমাণ পাওয়া যাবে বইকি। আমি হলফ করে বলছি। যে বাড়িতে বড় হয়েছি তার আনাচকানাচ চিনব না তাও কি হয় ! কেস মুলতুবি থাক।যদি জানতে চান কত বড় শয়তানি চাল চালতে চলেছে ওরা, তাহলে এই মুহূর্তে আমায় সাহায্য করা হোক। একবার ফোর্স নিয়ে আমাদের পৈত্রিক বাড়িতে এক্ষুণি যেতেই হবে হুজুর।”
ভাইটার মাথাটা খারাপই হয়ে গেল তাহলে, কপাল চাপড়ে ভাবেন উমেশ। অথচ জজ কি ভেবে অর্ঘ্য’র কথাগুলো মন দিয়ে শোনেন। অনুমতি পেয়েই অর্ঘ্য পাগলের মত প্রায় ছুটে কোর্টরুম থেকে বেরোয়। উমেশ, তার উকিলবাবুকে নিয়ে পুলিশ আর কোর্টের অফিসারের সাথে পেছন পেছন রওনা দেন। অবাক হয়ে বসে থাকে বাজোরিয়া’রা।
পৌঁছিয়ে অর্ঘ্য বড় গেটের চৌকিদারকে এক ধাক্কায় সরিয়ে দেয়। এক আসুরিক শক্তি পরিচালনা করছে তাকে। সোজা বাড়ির পেছন দিকে চলে যায় সে। উঠোনের শেষে দুই ধাপ সিঁড়ি নেমেই চোরকুঠুরির দরজা। খুলে আরও কয় ধাপ সিঁড়ি নামতে হয়। হাতে হাতে মোবাইলের আলোয় খুঁজে পাওয়া গেল নোনা ধরা দেওয়ালে একটা সুইচ। অল্প আলোয় ঘরটার এক কোণে পৌঁছে অর্ঘ্যকমল পুরনো সিন্দুকের তালাটা ধরে হ্যাঁচকা টান দিতে শুরু করে। তার হাত কেটে রক্ত পড়ছে দেখে সাথের কর্মচারীকে নির্দেশ দিতে বাধ্য হয় পুলিশ অফিসার। ভেতরে সত্যিই মোটা মোটা কাগজে অনেক কিছু লেখাজোকা। উমেশ ও অর্ঘ্য’র বকলমে একটি দলিল তৈরি করা হয়েছে। তার মর্মার্থ এই যে, চূড়ান্ত অর্থকষ্টের জন্য দুই ভাই স্বেচ্ছায় বাজোরিয়া ফ্যামিলির কাছেই নিজস্ব পৈত্রিক বাড়ি বিক্রি করে দিয়েছেন। এ সম্পত্তিতে তাদের স্বত্ব আর কিছুই থাকছে না।
চিৎকার করে ওঠেন উমেশ, “এটা কি স্যার ! এরকম কোন দলিল আমরা তো কোনদিন চোখেই দেখিনি ! সই করা তো দূরের কথা ! এ সব কার বানানো ! কোন শয়তান এ ভাবে বাড়িটা হাত করার চেষ্টা করেছে !”
হাতের লেখা এবং সাক্ষর বিশেষজ্ঞরা ধরে ফেললেন টনি বাজোরিয়ার কু-কীর্তি। ভাড়া নেওয়ার সময় থেকেই অসাধু উদ্দেশ্য তার মগজে বসবাস করেছে। প্রথম কাগজপত্রের থেকে বাড়ির আসল মালিকদের সইসাবুদ নকল করে নিতে তার আটকায়নি। তা ব্যবহার করে ধীরে ধীরে জাল দলিল তৈরি করা হয়েছে। প্রয়োজন মত হাতের এই তুরুপের তাস’টি পেশ করার পরিকল্পনা মাথায় নিয়েই এতদূর এগোচ্ছিল সানি বাজোরিয়া। তার সাথের ভদ্রলোক, মহিলা কেউই তার পিতামাতা নয়। এরা শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয়, নানা রাজ্যে বড় বড়, পুরনো স্থাবর সম্পত্তির খোঁজ করে বেড়ায়। সম্পত্তির স্বত্তাধিকারী অল্প সংখ্যার হলে সুবিধে বাড়ে। ধীরে ধীরে তাদের বিশ্বাস জিতে নিতে শুরু করে দেয় এরা। তারপর একসময়ে ঝোপ বুঝে কোপ মারে। ভাড়া আটকে রাখে কিছুদিন। অপর পক্ষ আপত্তি তুললেই জাল কাগজপত্র বানিয়ে প্রমাণ করে দেয় যে অর্থাভাবে মালিকরাই পৈত্রিক সম্পত্তির দায়ভার বহন করতে অসমর্থ হয়ে বেচে দিয়েছেন সবটুকু।
****
বাজোরিয়াদের আসল পরিচয় উদ্ধার হওয়ার পর তারা কয়েদ হোল বটে। অর্ঘ্য বেশ কদিন নিজের ফ্ল্যাটে অকাতরে ঘুমল। তারপর একদিন সকালে ঘুম ভেঙে উঠে তৈরি হয়ে তড়িঘড়ি অফিসে ছুটল। বিল্ডিং এর গেটে ঢোকার মুখে বুড়ো ভিখিরী মানুষটা আজও বসে আছে। খুচরো শুধু নয়, অর্ঘ্যকমল পকেট হাতড়ে কিছু নোট বের করেছে। ভিখিরীর দু-হাত ধরে কিসের জন্য যেন অবিরত ক্ষমা চাইল সে। তারপর তার হাতের মুঠোয় টাকা কটা গুঁজে দিয়ে, উঠে দাঁড়িয়ে কান এঁটো করা একটা হাসি হাসল। অফিসের লিফটে চড়ে ওপরে উঠেই পিয়নের সাথে ধাক্কা। সে সভয়ে সরে দাঁড়ানোর আগেই তার কাঁধে হাত দিয়ে অর্ঘ্যকমল এবার বলে ফেলে, ‘সরি ত্রিভুবনদা। বড্ড তাড়াহুড়ো করে এসেছি তো। প্লিজ, এক কাপ চা দাওনা গো।”
সহকর্মীরা তাদের পুরনো কলিগকে ফিরে পেয়ে খুশি। বাড়ি ফেরার পথে সরকারের দোকানে লিস্টি মিলিয়ে পুরনো অর্ঘ্য পাই-পয়সা মিটিয়ে দেয়। “আরে দাদাবাবু, আপনাকে কবে থেকে চিনি। টাকাটা পরে দিলেও তো হোত,” দোকানদার বলেন।
“না কাকু, হবেনা। বকেয়া রাখব না কিছুই। তাতে শান্তি নেই। সারাদিনের পরিশ্রম সেরে ঘরে ফিরে দুটো খেয়ে, নির্ভেজাল একটা ঘুম দেব এবার থেকে। এর চেয়ে জীবনে আর সুখ কি আছে, বল দেখি,” মিষ্টি হেসে বাসার দিকে পা বাড়ায় অর্ঘ্যকমল।
♦—♦♦—♦♦—♦♦—♦
❤ Support Us








