Advertisement
  • ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
  • জানুয়ারি ২৮, ২০২৪

ধারাবাহিক: পাহাড়িয়া পথে পথে। পর্ব ৮

ফাল্গুনী দে
ধারাবাহিক: পাহাড়িয়া পথে পথে। পর্ব ৮


ভুবন পাহাড় আর গিরিশৃঙ্গের প্রতি তাঁর দুর্ভেদ্য আকর্ষণ উৎসবমুখর করে তোলে ভূগোলের বিদ্যাযাপন । পেশা আর নেশা যখন একাকার হয়ে ওঠে, তখনই তাঁর অনুভূতিকে অন্যভাবে জাগিয়ে তোলে— ‘শেষের কবিতার’ শোভনলালের পাহাড়ের পথে পথে ঘুরে বেড়ানোর বেহিসেবিয়ানা । গন্তব্য জগতের এক শৃঙ্গ থেকে আরেক শৃঙ্গ 

♦ পর্ব ৮ ♦

দশমীর সিঁদুর খেলা মিলিয়ে গেছে মহানন্দার আকাশে। ঢাকের আওয়াজ আর আলোর রোশনাই যাই যাই করেও থেকে গেছে কিছু, দূরে আরও দূরে কোথাও। বিজয়া পরবর্তী শিলিগুড়ির আকাশ এখন বেশ থমথমে। ধূসর কালো মেঘ ঘনিয়ে এসেছে বারান্দায়, সঙ্গে দু-এক পশলা বৃষ্টি। পরিবারের সঙ্গে এখানে দিন কয়েক পুজোর ছুটির আবহে আদরের উষ্ণতা এবং শীতের কাঁপুনি দুটোই বেশ জমে উঠেছে। কম্বল ছেড়ে বেরোতেই ইচ্ছে করে না বিকট ঠান্ডায়। দল রওনা দেওয়ার দিন কয়েক আগেই আমি চলে এসেছি, তাই দলের সাথে আমার যাত্রা শুরু শিলিগুড়ি থেকে। ভোর ভোর উঠে পড়েছি অ্যালার্মের আগেই। নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে যখন পৌঁছালাম, গাড়ির মাথায় ব্যাগপত্র বেঁধে দলের সদস্যরা হালকা মেজাজে এদিক ওদিক ব্যস্ত ঘুরে বেড়াচ্ছে শেষবেলার আয়োজনে। ব্যাগ কাঁধে আমাকে আসতে দেখে বেশ কয়েকটি অচেনা মুখ ঠিকঠাক আন্দাজ করেই করমর্দন বাড়িয়ে দিল। সেলফি ফ্রেমে আমিও চটজলদি সেঁধিয়ে গেলাম। আমাদের বর্তমান দলটি এর আগে পশ্চিম হিমালয়ের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ট্রেক রুটে সাফল্যের সঙ্গে অভিযান করেছে, সদস্যদের গড় বয়স সাঁইত্রিশ, সুতরাং অভিজ্ঞতা এবং স্ফূর্তির কমতি হবে না বলাই বাহুল্য। আমি এই দলের নতুন সদস্য। ব্রতীন’দা ছাড়া বাকি সদস্যদের সঙ্গে আজই আমার প্রথম আলাপ। যাইহোক ভালোবাসার নিয়মেই বিদায় মুহূর্তে রুকস্যাক ভারী হয়ে আসে আত্মজনের ভারী চোখের পাতায় আর অবুঝ মনের উৎকণ্ঠায় — “We sever now in this good-bye. We all shall miss thy gentle grace. Thy willing hand and cheerful face; No other friend thy place can fill” (Grinnell Willis).

কুয়াশার অভয়ারণ্য ধরে আমাদের গাড়ি রওনা দিল তখন সকাল সাতটা। কাঁচ নামিয়ে ছবি তুলতে গেলে ঠান্ডা বাতাস যেন সূঁচ ফোটায় গায়ে। তড়িঘড়ি জানলা তুলে পকেটে হাত ঢুকিয়ে শুধু অসহায় তাকিয়ে থাকা ঝাপসা কাঁচের ওপারে।বাতাসের সংকেত খুব একটা স্বাভাবিক নয়। চোখের আড়ালে অশরীরী ছায়ার মত কেউ যেন চলাফেরা করে নিঃশব্দে। কালিম্পংয়ের পথে সেবকের কাছে তিস্তা যেন অহেতুক থমথমে। অবশ্য সেসব তোয়াক্কা না করে গাড়ির মধ্যে একটু চাপাচাপি করেই আমাদের আড্ডায় আজ যোগ দিয়েছেন অরিজিৎ সিং কুমার শানু অনুপম রায় প্রমূখ। তিস্তার পাড়ে পাড়ে ১০ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে আমাদের গাড়ি ছুটে চলেছে তীব্র গতিতে। তিস্তা বাজার পেরিয়ে মেল্লি থেকে রাস্তা যেন চুলের কাটার মতো আচমকা ঘুরে সটান বামদিকে উঠে গেছে যোর্থাংয়ের পথে। এই মেল্লির কাছেই পূর্ব দিক থেকে আসা তিস্তা নদীর সঙ্গে, পশ্চিম দিক থেকে আসা রঙ্গিত নদী মিলিত হয়েছে মোহময় ত্রিবেণী সঙ্গমে। নির্ণয় করেছে সিকিম এবং পশ্চিমবঙ্গের সীমানা। নদীর উত্তাল বাঁকে পাথুরে এবং বালিময় প্রান্তরের উপর রঙিন তাঁবু খাটিয়ে বিস্তর লোক জড়ো হয়েছে জীবনকে চেটেপুটে উপভোগ করতে। এমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লোভ সামলাতে না পেরে আমরাও গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। ব্রেকফাস্ট অর্ডার করা হলো দীর্ঘক্ষণ সহ্য করে থাকা পেটের বিদ্রোহে সম্মতি দিয়ে। ব্রতীন’দা একটা সিগারেট ধরিয়ে হেঁটে গেল দূরে। রাস্তা থেকে অনেক নিচে দেখি অশান্ত যুবতীর মতো বইতে থাকা তিস্তার বুকে একদল দুরন্ত ছেলেমেয়ে অসম্ভবকে আয়ত্ত করতে নেমেছে। সিকিমের এই মেল্লি শহরটি নদীর বুকে ‘ভেলা নিয়ে ভেলকি বাজি’ বা সাহেবি কায়দায় River Rafting এর জন্য বিখ্যাত। বহু টাকা ব্যয় করে নদীর এই বরফঠান্ডা জলে শীত সকালে জীবনকে হাতের মুঠোয় ধরে দূর দূরান্ত থেকে যারা বাজিমাত করতে আসে এরা কারা ? এরাই রবীন্দ্রনাথের ‘নতুন যৌবনের দূত’, নজরুলের ‘অরুণ প্রাতের তরুণ দল’, সুকান্তের ‘দুঃসহ আঠারো বছর’। পাড়ে বসে একমনে এই বয়ে যাওয়া দেখতে বেশ ভালোই লাগে। জীবনের মতোই তো ! উত্থান পতন। আমার সম্বিৎ ফিরিয়ে ড্রাইভার তারস্বরে হর্ন পাড়ে। এবার যেতে হবে।

শিলিগুড়ি থেকে ইয়াকসম এর দূরত্ব সড়কপথে প্রায় ১৫০ কিমি। পাকদন্ডী বেয়ে উঠতে উঠতে সরলবর্গীয় বনবিথির ছায়া প্রায় আকাশের মাথা থেকে নেমে আসে রাস্তায়। বেলা হোক কি অবেলা, যখন তখন এখানে পাড়া বেড়ানো মেঘের আনাগোনা। এমন বেয়াদপি আবদার স্থানীয়রা মেনে নিয়েছে দিনগত অভ্যাসে। হটাৎ খেয়াল হলো এতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের বাম হাত ধরে হাঁটছিল তিস্তা কিন্তু যোর্থাংয়ের পথে এখন দেখি সে দায়িত্ব নিয়েছে রঙ্গীত। যতদূর চোখ যায় বিক্ষিপ্ত পাহাড়ি ঢালে ঘন সবুজ জঙ্গলের মোহ ভঙ্গ করে বসে আছে ছবির মত সুন্দর পাহাড়ি গ্রাম। এখানকার ঘর বাড়িতে লাল নীল সবুজ ঢেউ খেলানো টিনের ছাউনির প্রান্তে সাদা আলপনার মতো কাঠের কারুকার্য হিমালয় পথের আশ্চর্যকে যেন বহু গুণ বাড়িয়ে তোলে। এমন সুন্দর দৃশ্য লেন্সবন্দি করতে ক্যামেরা তাক করে বসে আছে সপ্তর্ষি। ক্যামেরার শাটার স্পিডের মতোই দুর্ধর্ষ তার কমিক সেন্স। তাই তাকে একজন পোড়খাওয়া বিদূষক বললে অত্যুক্তি হয় না। ছবির তাগিদে মাঝে মাঝেই তার গাড়ি থামানোর আবদার সহাস্যে মেনে নেয় নেপালি ড্রাইভারটি। সিকিম ভারতবর্ষের একটি অন্যতম ছোট রাজ্য হলেও পরিবেশ পরিচ্ছন্নতায় তাবড় বড় বড় রাজ্যকে টেক্কা দেবে। কোথাও কোন আবর্জন নেই, আকাশে ওড়ে না অহেতুক প্লাস্টিক। শহরে জায়গায় জায়গায় প্রয়োজনীয় ডাস্টবিন। এমনকি খোলা জায়গায় সিগারেট খেলেও জরিমানার রশিদ নিয়ে পাকড়াও করতে আসে কর্তব্যরত পুলিশ। এমন পরিচ্ছন্নতায় ঈশ্বর বাস করেন নাকি এই পরিচ্ছন্নতার অন্য নাম ঈশ্বর সে এক দীর্ঘ তর্কের বিষয়। এদিকে আমাদের রাস্তাও কম দীর্ঘ নয়। ভারী পাওয়ারের চশমায় মোবাইলে চোখ রেখে অর্পণ গুগল ম্যাপ দেখে নিশ্চিত করে আমরা যোর্থাং এসে পড়েছি। বেশি সময় নষ্ট না করে কিছু প্রয়োজনীয় কেনাকাটা সেরে গাড়ি আবার রওনা দিল। এবার রঙ্গীত কে ডানহাতে রেখে পাহাড়ি রাস্তা উঠে গেছে পেলিংয়ের পথে। গাড়ির মধ্যে প্রায় সকলেরই চোখের নেমে এসেছে ক্লান্তির ঘুম। গান বেজে চলেছে নিজের নিয়মে কিন্তু এরই মধ্যে একনাগাড়ে প্রয়োজনীয় কথা-আলাপ ফিসফিস করে সেরে নিচ্ছেন নির্বিবাদী শান্তিপ্রিয় রথীন’দা। দরকারে অদরকারে রথীন’দাকে চটানোর সুযোগ কেউ হাতছাড়া করতে চায় না। গাড়ির মধ্যেই চলছে টুকরো টুকরো ঠাট্টা ইয়ার্কি এবং মাঝেমধ্যেই বিকট উল্লাস।

পেলিংকে বাইপাস করে আমাদের আজকের গন্তব্য ইয়াকসম। কিন্তু পেলিং যেতে পারলে বেশ খানিক অত্যাশ্চর্য পাহাড়ি অর্কিডের খোঁজখবর পাওয়া যেত। ফেরার পথে ঘন্টাখানেক সময় পাওয়া যাবে নাকি ? ভাঙ্গা ভাঙ্গা হিন্দিতে অতীন’দার কাতর আবেদন ড্রাইভার মুচকি হেসে শুনলে বটে কিন্তু জবাব দিলে না। ব্যবসার পাশাপাশি অতীন’দা শখের ফুল চাষিও বটে। কাকদ্বীপের বাড়িতে তার বাগানজোড়া অর্কিডের রং বাহার। তাশিডিং মনেস্ট্রি ছাড়িয়ে আমরা যখন উপরে উঠছি নদীর কলরব আর কানে আসে না। গাড়ির জানলা দিয়ে দেখি আশেপাশে চলমান টুরিস্টের ভিড়। আমাদের গাড়ি এসে দাঁড়ালো কাঞ্চনজঙ্ঘা জলপ্রপাতের পাশে। ধারাস্রোতের এপার ওপার জুড়ে দিয়ে জিপ লাইনিং চলছে সরকারি উদ্যোগে। এদিকে সময় বেলা তিনটে গড়িয়ে হেঁটে গেছে অবেলার পথে। রা-বাংলা, পেলিং ইত্যাদি নানান জায়গায় বেড়াতে আসা মানুষের দল এখানে ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে শুধু সেলফি তোলে, জলকেলি করে অহেতুক। এরা দুচোখ ভরে তাকিয়ে দেখে না, সৌন্দর্য অনুভব করে না। হাওয়ার দাপটে একটু অসতর্ক ভিজে গেলে এদের সর্দি লেগে যায়। দুদণ্ড ভাবুকের মতো হারিয়ে যাবার সময়ও এদের হাতে নেই। হিমালয়ের নির্মল অন্দরমহলে এসেও মানুষের কিসের যে এতো তাড়া ! কিন্তু আমাদের তাড়া ছিল, কারণ আমাদের গন্তব্য আরও দূরে আরও উপরে — “The woods are lovely, dark and deep, But I have promises to keep, And miles to go before I sleep, And miles to go before I sleep. (Robert Frost).

অবশেষে ১৮ তারিখ বিকেল ৪টে নাগাদ ইয়াকসম পৌঁছালে আমাদের গাড়ি চলা পথ শেষ হলো। শহরটির উচ্চতা ৫৬৪৩ ফুট। একটু আগে সামান্য বৃষ্টিপাতের সাক্ষী বুকে নিয়ে পড়ে আছে ভিজে রাস্তাঘাট। কাল সকালে এখান থেকেই পাহাড়ি পদযাত্রা শুরু। আমাদের দেরি দেখে গাইড মহাশয় সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে অপেক্ষায় না দাঁড়িয়ে বেশ খানিক দূর অব্দি এগিয়ে এসেছেন। পরিচয় পত্র নিয়ে আমরা তার পিছু পিছু রওনা দিলাম। মালপত্র নিয়ে আমাদের গাড়ি রওনা দিল হোটেলের পথে। সমস্ত রাস্তায় ব্রতীন’দার অগণিত সিগারেটের মধ্যে আরও একটি সফল অগ্নিসংযোগ জ্বলে উঠলো দ্রুত। হাঁটতে হাঁটতে আমরা পৌঁছালাম কাঞ্চনজঙ্ঘা ন্যাশনাল পার্কের ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টারে। এখানে সকলের সচিত্র পরিচয়পত্র এবং পার্ক ফি জমা দিলে তবেই গোচেলার পথে হাঁটবার আদেশনামা পাওয়া যাবে। ক্লান্তির কথা ভেবে আমরা পৌঁছবার আগেই কাগজপত্রের সব ব্যবস্থা গাইড করে রেখেছে। অফিস রুমের বাইরে দেওয়ালে লেখা নানান নিয়মের ফিরিস্তি পড়ে ফেললাম দ্রুত। অবশেষে সই সাবুদের পালা চুকিয়ে দুপুরের খাওয়া দাওয়া সেরে হোটেলের রুমে নরম বিছানায় শরীর একটু এলিয়ে দিতেই ঝুপ করে সন্ধ্যে নেমে এলো। আগামী দিনগুলিতে আর স্নানের সুযোগ নেই তাই হোটেলের গরম জলে অবগাহনের এই শেষ সুযোগ কেউ হাতছাড়া করতে রাজি নয়। রাতে দেশি মুরগির প্রাণনাশকারি ভোজনের আগে আরও একটি গুরু দায়িত্ব এখনও বাকি। সঙ্গে দুটি লোক নিয়ে গাইড হাজির। পা থেকে মাথা পর্যন্ত আমাদের সমস্ত প্রয়োজনীয় জুতো জামা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে ওদের তত্ত্বাবধানে। এদিকে একটি পথচলতি কুকুরকে বাড়ি অব্দি ডেকে এনে সপ্তর্ষি তাকে নাগাড়ে আদর করতে ব্যস্ত। রথীনদা ব্যস্ত প্রিয় ফোনালাপে। ব্রতীন দার অনুরোধে অর্পনের গুনগুন রবীন্দ্রনাথ গলা ছেড়ে বেরিয়ে এলেন তারস্বরে। অবশেষে সব কাজ সেরে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময়টি আর কারোর খেয়াল নেই। সকালে ঘুম ভাঙলো নিরবিচ্ছিন্ন প্রায়ান্ধকার ধূসর ঝমঝম বৃষ্টি এবং চড়াম চড়াম বাজ পড়ার শব্দে।

 

ক্রমশ…

আগের পর্ব পড়ুন:

ধারাবাহিক: পাহাড়িয়া পথে পথে। পর্ব ৭


  • Tags:

Read by:

❤ Support Us
Advertisement
homepage block Mainul Hassan and Laxman Seth
Advertisement
homepage block Mainul Hassan and Laxman Seth
Advertisement
শিবভোলার দেশ শিবখোলা স | ফ | র | না | মা

শিবভোলার দেশ শিবখোলা

শিবখোলা পৌঁছলে শিলিগুড়ির অত কাছের কোন জায়গা বলে মনে হয় না।যেন অন্তবিহীন দূরত্ব পেরিয়ে একান্ত রেহাই পাবার পরিসর মিলে গেছে।

সৌরেনি আর তার সৌন্দর্যের সই টিংলিং চূড়া স | ফ | র | না | মা

সৌরেনি আর তার সৌন্দর্যের সই টিংলিং চূড়া

সৌরেনির উঁচু শিখর থেকে এক দিকে কার্শিয়াং আর উত্তরবঙ্গের সমতল দেখা যায়। অন্য প্রান্তে মাথা তুলে থাকে নেপালের শৈলমালা, বিশেষ করে অন্তুদারার পরিচিত চূড়া দেখা যায়।

মিরিক,পাইনের লিরিকাল সুমেন্দু সফরনামা
error: Content is protected !!