Advertisement
  • দে । শ
  • জুন ২৯, ২০২৬

কেন্দ্রের জবাবদিহির সময় পেরোতেই অনির্দিষ্টকালের অনশনে সোনম । জন্তর মন্তরে ‘সিজেপি’-র মঞ্চে কৃষক-ছাত্রদের ভিড়

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
কেন্দ্রের জবাবদিহির সময় পেরোতেই অনির্দিষ্টকালের অনশনে সোনম । জন্তর মন্তরে ‘সিজেপি’-র মঞ্চে কৃষক-ছাত্রদের ভিড়

শেষ পর্যন্ত কথামতোই অনশনের পথ বেছে নিলেন লাদাখের সমাজকর্মী ও পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুক। কেন্দ্রের কাছে জবাবদিহির জন্য বেঁধে দেওয়া সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পর রবিবার দিল্লির জন্তর মন্তরে ‘ককররোচ জনতা পার্টি’-র আন্দোলনে যোগ দিয়ে অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করলেন তিনি। তাঁর দাবি ছিল, শিক্ষাব্যবস্থায় প্রশ্নপত্র ফাঁস-সহ একাধিক অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত, দায় নির্ধারণ এবং লাদাখের পরিবেশ ও সাংবিধানিক সুরক্ষা নিয়ে কেন্দ্রকে স্পষ্ট অবস্থান জানাতে হবে। সরকারের তরফে প্রত্যাশিত কোননো প্রতিক্রিয়া না মেলায় শেষ পর্যন্ত আন্দোলনের পথেই হাঁটলেন রামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কারপ্রাপ্ত এই শিক্ষাবিদ।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই নিট প্রশ্নপত্র ফাঁস-সহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে কেন্দ্রের সমালোচনায় সরব ছিলেন ওয়াংচুক। কয়েক দিন আগে সমাজমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিও বার্তায় তিনি স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, ২৭ জুনের মধ্যে সরকার যদি দুটি বিষয়ে— শিক্ষাব্যবস্থায় জবাবদিহি এবং লাদাখের পরিবেশ, সংস্কৃতি ও মানুষের অধিকার রক্ষার প্রশ্নে— দৃশ্যমান পদক্ষেপ না করে, তা হলে তিনি ২৮ জুন থেকে অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করবেন। পরে শনিবার পর্যন্ত কার্যত কেন্দ্রকে সময় দেন তিনি। কিন্তু সে সময়সীমার মধ্যেও সরকারের তরফে কোনো ইতিবাচক বার্তা না আসায় রবিবার থেকেই জন্তর মন্তরে অনশনে বসেন।

অনশন শুরুর আগে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের সঙ্গে রাজঘাটে যান ওয়াংচুক। সেখানে মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানান দু–জনে। পরে জন্তর মন্তরে ফিরে উপস্থিত আন্দোলনকারীদের সঙ্গে নীরবতা পালন করে অনশন শুরু করেন। আন্দোলনের মঞ্চে তখন উপস্থিত শত শত ছাত্রছাত্রী, যুবক-যুবতী, কৃষক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং অন্যান্য সদস্যেরা। তাঁদের অনেকেই ওয়াংচুকের অনশনের প্রতি সংহতি জানিয়ে প্রতীকী উপবাসেও সামিল হন। ওয়াংচুক বলেন, ‘আমি আনন্দের সঙ্গে এখানে বসিনি। পরিস্থিতি আমাকে বাধ্য করেছে। অনেকে প্রশ্ন করছেন, লাদাখের আন্দোলন ছেড়ে আমি কেন এ আন্দোলনে যোগ দিলাম। কিন্তু শিক্ষা আমার জীবনের সঙ্গে গত চল্লিশ বছর ধরে জড়িয়ে রয়েছে। ছাত্রাবস্থা থেকেই মনে করেছি, কোনো দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে তার শিক্ষাব্যবস্থা। সে কারণেই যখন দেশের তরুণ প্রজন্ম শিক্ষাব্যবস্থার দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছে, তখন আমি কী করে নীরব থাকতে পারি?’

শুধু শিক্ষা নয়, লাদাখের পরিবেশ ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নও তাঁর আন্দোলনের অন্যতম ভিত্তি বলে জানান ওয়াংচুক। তিনি বলেন, ‘শিক্ষা ও পরিবেশ— দুটিই আমার লড়াই। সত্য এবং শান্তি আমার পথ, ন্যায়বিচার আমার গন্তব্য।’ হিমালয় রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে তাঁর বক্তব্য, এই পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন জলের উপর কয়েকশো কোটি মানুষের জীবন নির্ভর করে। ফলে লাদাখের পরিবেশ ধ্বংস হওয়া কেবল একটি রাজ্যের সমস্যা নয়, সমগ্র উপমহাদেশের উদ্বেগের বিষয়। তাঁর অভিযোগ, সরকার যদি সময়মতো সংবেদনশীলতা দেখাত, তা হলে তাঁকে এই তীব্র গরমে রাস্তায় বসে অনশন করতে হতো না। কেন্দ্র সরকারের উদ্দেশে বার্তা দিয়ে ওয়াংচুক বলেন, ‘যখন কোনো জবাবদিহি থাকে না, তখন গণতন্ত্র প্রিয় মানুষের সামনে একমাত্র পথ শান্তিপূর্ণ আন্দোলন। আমরা সে পথেই এগোব।’ কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘কোনো নেতা যদি নিজের ভুল স্বীকার করেন, তাতে তাঁর মর্যাদা কমে না, বরং তিনি আরও বড়ো নেতা হয়ে ওঠেন। গণতন্ত্রে নেতৃত্বের অর্থই হল সংবেদনশীলতা আর দায় স্বীকার করার মানসিকতা।’

অনশন মঞ্চ থেকে দেশবাসীর উদ্দেশ্যেও বার্তা দিয়েছেন সোনম ওয়াংচুক। তাঁর আহ্বান, যাঁরা দিল্লিতে এসে আন্দোলনে যোগ দিতে পারবেন না, তাঁরা অন্তত নিজেদের রাজ্য, শহর বা গ্রামে এক দিনের প্রতীকী অনশন পালন করুন। তাঁর দাবি, ‘এটি শুধু নিট বা একটি পরীক্ষার প্রশ্ন নয়। শিক্ষা, পরিবেশ, বিশুদ্ধ বায়ু, জল এবং সরকারের জবাবদিহি— সব কিছুর সঙ্গে এই আন্দোলন জড়িয়ে রয়েছে।’ জন্তর মন্তরে চলা আন্দোলনের সূত্রপাত অবশ্য নিট প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং অন্যান্য পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে। গত ২০ জুন থেকে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সেখানে অবস্থান-বিক্ষোভ শুরু করে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। দলের অভিযোগ, একের পর এক সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস, অনিয়ম এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফলে শিক্ষার্থীদের আস্থা ভেঙে পড়েছে। শুধু নিট নয়, সাম্প্রতিক মহারাষ্ট্র শিক্ষক যোগ্যতা পরীক্ষা (টেট) বাতিলের ঘটনাও সরকারের ব্যর্থতার উদাহরণ বলে দাবি করেছে সংগঠনটি।

এদিন, সিজেপি-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বলেন, তাঁদের আন্দোলন কোনো একক পরীক্ষা বা একটি ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং দেশের গোটা শিক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা, নির্ভরযোগ্যতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবিতেই এই আন্দোলন। তাঁর মতে, ‘মানুষ ভাবছেন এটি শুধু নিটের আন্দোলন। কিন্তু এটি কেবল শুরু। শিক্ষা ব্যবস্থার পরে নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়েও আমরা সরব হব।’ তিনি ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)-এর প্রসঙ্গ টেনে দাবি করেন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির উপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে বিস্তৃত সংস্কার প্রয়োজন। দিল্লিতে, ওয়াংচুকের পাশে দাঁড়িয়ে আন্দোলনের সমর্থনে উপস্থিত হন একাধিক কৃষক নেতা। উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, পঞ্জাব এবং ওড়িশা থেকে আসা কৃষক প্রতিনিধিদের অনেকেই আন্দোলনে যোগ দেন। যদিও দীপকের অভিযোগ, দিল্লিতে পৌঁছনোর আগেই উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা এবং পঞ্জাবের বহু কৃষক নেতাকে গৃহবন্দি করা হয়েছে। প্রায় ৫০০ কৃষক নেতা ও বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যকে রাজধানীতে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়েছে।

এ দিন ‘সর্ব খাপ পঞ্চায়েত’-এর প্রতিনিধিরাও জন্তর মন্তরে এসে অভিজিৎ দীপকের মাথায় প্রতীকী পাগড়ি পরিয়ে দেন। সংগঠনের সমন্বয়কারী ওমপ্রকাশ ধানকর বলেন, ‘এই পাগড়ি সম্মানের পাশাপাশি দায়িত্বেরও প্রতীক। সেই দায়িত্বই আমরা তাঁর হাতে তুলে দিচ্ছি।’ ওড়িশার কৃষক নেতা অক্ষয় কুমার বলেন, ধর্মেন্দ্র প্রধান যদি পদত্যাগ না করেন, তা হলে আগামী নির্বাচনে তাঁকে রাজনৈতিক মূল্য চোকাতে হবে। অন্য দিকে কৃষক নেতা আত্তার সিং কাদিয়ানের অভিযোগ, কেন্দ্র দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে ব্যর্থ হয়েছে। আন্দোলনের মঞ্চে উঠে আসে ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তার প্রশ্নও। গত বছর জয়পুরের নীরজা মোদি স্কুলের চতুর্থ তলা থেকে পড়ে মৃত্যু হওয়া ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী আমায়রার পরিবার এ দিন উপস্থিত হয়ে অভিযোগ করে, ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে দেখানো হলেও প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পুলিশের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিলে অযথা দেরির অভিযোগও তোলেন তাঁরা।

প্রসঙ্গত, গত ৬ জুন জন্তর মন্তরে সিজেপি-র প্রথম বিক্ষোভ কর্মসূচিতেও উপস্থিত ছিলেন ওয়াংচুক। সে সময় অভিজিৎ দীপকেকে গ্রেফতার করা হতে পারে বলে জল্পনা তৈরি হয়েছিল। তখনই ওয়াংচুক জানিয়েছিলেন, যদি আন্দোলন দমন করার চেষ্টা হয়, তা হলে তিনি অনশনের পথে যাবেন। প্রায় তিন সপ্তাহ পর সেই ঘোষণাই বাস্তবে রূপ নিল। লাদাখকে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা এবং সাংবিধানিক সুরক্ষার দাবিতে আন্দোলনের জেরে গত বছর জাতীয় নিরাপত্তা আইন (এনএসএ)-এর অধীনে গ্রেফতার হয়েছিলেন ওয়াংচুক। প্রায় ছয় মাস জোধপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি থাকার পর চলতি বছরের মার্চে তাঁর বিরুদ্ধে এনএসএ প্রত্যাহার করা হলে তিনি মুক্তি পান। মুক্তির কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি ফের আন্দোলনের ময়দানে। তবে এ বার তাঁর লড়াই শুধু লাদাখের জন্য নয়; শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, পরিবেশ রক্ষা এবং সরকারের জবাবদিহির দাবিতেও।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!