Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • জুলাই ৯, ২০২৬

এসআইআর, ভোটপর্বের পর এবার জনগণনার দায়িত্ব ! জরিমানা-জেলের হুঁশিয়ারিতে ক্ষোভ, প্রশ্নের মুখে পঠনপাঠন

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
এসআইআর, ভোটপর্বের পর এবার জনগণনার দায়িত্ব ! জরিমানা-জেলের হুঁশিয়ারিতে ক্ষোভ, প্রশ্নের মুখে পঠনপাঠন

পশ্চিমবঙ্গের সরকারি, সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলগুলি এমনিতেই শিক্ষক-কর্মচারী সংকটে ধুঁকছে । বিগত জামানায় নিয়োগে একের পর দুর্নীতির অভিযোগ, আদালতের রায়ে প্যানেল বাতিলে চাকরি খুইয়েছেন ২৬ হাজারের বেশি শিক্ষক-অশিক্ষক কর্মীরা । এরই মধ্যে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন বা ‘এসআইআর’-এর মহাযজ্ঞ, ভোটপর্বের দীর্ঘ কাজ, নতুন সরকারের প্রকল্প বাস্তবায়নের বিশেষ দায়িত্বের পর আবারও শিক্ষকদের কাঁধে প্রশাসনিক দায়িত্বের বাড়তি বোঝা । ২০২৭ সালের জনগণনার কাজে সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা, প্রধান শিক্ষক, এমনকি শিক্ষাকর্মীদেরও ব্যাপক হারে নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে । আর সে সিদ্ধান্ত ঘিরেই নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়েছে শিক্ষা মহলে । শিক্ষক সংগঠনগুলির আশঙ্কা, একের পর এক সরকারি কাজে শিক্ষকদের টেনে নেওয়া হলে স্কুলের পঠনপাঠন কার্যত মুখ থুবড়ে পড়বে ।

সম্প্রতি, কলকাতা পুরসভার জনগণনা বিভাগের তরফে সম্প্রতি জেলা স্কুল পরিদর্শকের (ডিআই) দফতরে পাঠানো একটি চিঠি ঘিরে বিতর্কের সূত্রপাত । ওই চিঠিতে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, জনগণনার দায়িত্ব পালন করা আইনত বাধ্যতামূলক । কোনো কর্মী বা শিক্ষক এ দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করলে তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে । এমনকি জনগণনা আইনের বিধান অনুযায়ী আর্থিক জরিমানা থেকে শুরু করে কারাদণ্ডের ব্যবস্থাও রয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে । জেলা স্কুল পরিদর্শকদের অনুরোধ করা হয়েছে, তাঁরা যেন সমস্ত স্কুল কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশিকা জারি করেন ।

এহেন নির্দেশ সামনে আসতেই বিভিন্ন স্কুলের প্রধান শিক্ষক এবং শিক্ষক সংগঠনগুলির মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে । অভিযোগ, বহু বিদ্যালয় থেকে অস্বাভাবিক সংখ্যায় শিক্ষক-শিক্ষিকাকে জনগণনার কাজে চাওয়া হয়েছে । কোথাও অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষককে এ কাজে মনোনীত করা হয়েছে, আবার কোথাও আবার দু-এক জন বাদে প্রায় স্কুলের সব শিক্ষদেরই নাম উঠে এসেছে তালিকায় । ফলে প্রশ্ন উঠছে, এত সংখ্যক শিক্ষক মাঠে নেমে গেলে স্কুলে পড়াবেন কারা ? শিক্ষা দফতর সূত্রে খবর,সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা, প্রধান শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী, এমনকি কলেজ ও পলিটেকনিকের কর্মীদের ইতিমধ্যেই জনগণনার ডিজিটাল পোর্টালে বহু শিক্ষক-শিক্ষিকার নামে অ্যাকাউন্ট তৈরি করা হয়েছে । তাঁদের ‘স্ট্যাচুটরি টাউন চার্জ এনিউমারেটর ফর সেন্সাস ২০২৭’ হিসেবে ‘লগ-ইন’ সংক্রান্ত তথ্যও পাঠানো হয়েছে । বিভিন্ন নথিতে একাধিক স্কুল, কলেজ ও পলিটেকনিক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং শিক্ষাকর্মীদের নাম দেখা গিয়েছে । কলকাতা শহরে ‘সেন্সাস সুপারভাইজার’ এবং ‘এনিউমারেটর’ হিসেবে প্রায় ১,৯০০ জনের নাম তালিকাভুক্ত হয়েছে বলে জানা গিয়েছে । তার মধ্যে সাতশোরও বেশি শিক্ষক-শিক্ষিকা রয়েছেন ।

কয়েকটি স্কুলের পরিস্থিতি বিশেষ ভাবে নজর কেড়েছে । কোথাও ৩০ জনের বেশি শিক্ষকের মধ্যে ২৯ জনের নাম জনগণনার তালিকায় রয়েছে, কোথাও আবার ৩৫ জনের মধ্যে ৩৩ জনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে । বহু ক্ষেত্রে একমাত্র বিষয়-শিক্ষক বা স্কুলের একমাত্র ক্লার্ককেও এ কাজে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে । ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির দৈনন্দিন কাজকর্ম কী ভাবে চলবে, তা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে । স্কুল কর্তৃপক্ষের উদ্বেগ আরও বেড়েছে মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ‘রেজিস্ট্রেশন’, ‘এনরোলমেন্ট’ ঘিরে । পর্ষদের নির্দেশ অনুযায়ী জুলাই মাসের মধ্যেই এই কাজ শেষ করতে হবে । আসন্ন পরীক্ষার সূচি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে । আগস্ট মাস থেকে শুরু হতে চলেছে দ্বিতীয় পর্যায়ক্রমিক পরীক্ষা । সেপ্টেম্বরে রয়েছে উচ্চ মাধ্যমিকের বিভিন্ন সেমেস্টারের পরীক্ষা । সে সময়ে যদি শিক্ষকরা জনগণনার প্রশিক্ষণ ও মাঠপর্যায়ের কাজে ব্যস্ত থাকেন, তা হলে পরীক্ষার প্রস্তুতি, ক্লাস নেওয়া, খাতা মূল্যায়ন — সবই বিঘ্নিত হতে পারে বলে মনে করছেন শিক্ষামহলের একাংশ ।

শিক্ষক সংগঠনগুলির বক্তব্য, গত কয়েক মাস ধরেই শিক্ষকদের উপর একের পর এক প্রশাসনিক দায়িত্বের চাপ ক্রমশ বেড়েছে । ‘এসআইআর’-এর কাজে বহু শিক্ষককে বিএলও হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছিল । বাড়ি বাড়ি সমীক্ষা থেকে ভোটার তালিকা যাচাই— দীর্ঘ সময় ধরে সে কাজ করতে হয়েছে তাঁদের । অনেক ক্ষেত্রে এখনো বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের উপভোক্তা যাচাইয়ের কাজেও তাঁদের ব্যবহার করা হচ্ছে । এর মধ্যেই জনগণনার মতো বিশাল কর্মসূচির দায়িত্ব এসে পড়ায় উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে । ‘সেন্সাস কর্মী ঐক্য মঞ্চ’-এর সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডলের দাবি, জনগণনা নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক কর্তব্য । কিন্তু সে দায়িত্ব পালনের নামে যদি প্রধান শিক্ষক ও অভিজ্ঞ শিক্ষকদের দীর্ঘ সময় স্কুলের বাইরে থাকতে হয়, তা হলে তার খেসারত দিতে হবে পড়ুয়াদেরই । তাঁর অভিযোগ, ‘এসআইআর’ চলাকালীন বহু শিক্ষক নিয়মিত স্কুলে উপস্থিত থাকতে পারেননি । ফলে গত কয়েক মাসে পঠনপাঠনের যে ক্ষতি হয়েছে, জনগণনার কাজ শুরু হলে তা আরও বাড়বে ।

একই সুর শোনা গিয়েছে ‘শিক্ষানুরাগী ঐক্য মঞ্চ’-এর তরফেও । সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক কিঙ্কর অধিকারী প্রশ্ন তুলেছেন, রাজ্যে বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত বেকার থাকা সত্ত্বেও কেন বারবার শিক্ষক-শিক্ষিকাদেরই এ ধরনের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে । তাঁর মতে, প্রশাসনিক কাজের জন্য পৃথক জনবল গড়ে তোলা সম্ভব হলে শিক্ষাব্যবস্থাকে এ ভাবে চাপে ফেলতে হতো না । শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে না থাকলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে শিক্ষার অধিকারই । মাধ্যমিক শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সংগঠনগুলিরও বক্তব্য, দীর্ঘ দিন ধরে শিক্ষক নিয়োগ না হওয়ায় বহু স্কুলে এমনিতেই জনবলের ঘাটতি রয়েছে । সে পরিস্থিতিতে একসঙ্গে এত সংখ্যক শিক্ষককে জনগণনার কাজে পাঠানো হলে বহু বিদ্যালয়ে কার্যত ক্লাস নেওয়াই অসম্ভব হয়ে পড়বে । অভিভাবকদের একাংশও উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, সরকারি স্কুলে পড়াশোনার ধারাবাহিকতা নষ্ট হলে ছাত্রছাত্রীদের ক্ষতি পূরণ করা কঠিন হবে ।

যদিও জনগণনা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, জনগণনা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক কর্মসূচি। নির্ভরযোগ্য এবং দায়িত্বশীল কর্মী হিসেবেই শিক্ষক-শিক্ষিকাদের এ কাজে বেছে নেওয়া হয়েছে । তবে শিক্ষা মহলের একাংশের প্রশ্ন, সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষাব্যবস্থাকে সচল রাখার দায়িত্বও কি সমান গুরুত্বপূর্ণ নয় ? প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি । তবে শিক্ষকদের উপর ক্রমবর্ধমান প্রশাসনিক দায়িত্বের চাপ নিয়ে যে নতুন বিতর্কের সূচনা হয়েছে, তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই । আর সে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটাই প্রশ্ন — ‘এসআইআর’, প্রকল্প বাস্তবায়ন, জনগণনা সবই হচ্ছে, কিন্তু পড়ুয়াদারের ভবিষ্যত নিয়ে ভাবছেন না কেউ !


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!