- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুলাই ১৬, ২০২৬
ভারতের ৬.৭৯ লক্ষ শিশুর কোনো টিকাকরণ হয়নি, হু-ইউনিসেফের রিপোর্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য
এক দিকে সাফল্যের ছবি, অন্য দিকে উদ্বেগের ছায়া। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) এবং ইউনিসেফের যৌথ সমীক্ষা বলছে, ভারতে নিয়মিত টিকাকরণের আওতা গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। ফলে ‘জিরো-ডোজ’ বা একটিও টিকা না-পাওয়া শিশুর সংখ্যা দ্রুত কমেছে। তবুও, ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে এমন শিশুর সংখ্যা ৬ লক্ষ ৭৯ হাজার। অর্থাৎ, কয়েক লক্ষ শিশু এখনো স্বাস্থ্যব্যবস্থার নাগালের বাইরে রয়ে গিয়েছে।
বুধবার, প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন-ইউনিসেফ এস্টিমেটস অব ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন কভারেজ’ রিপোর্টে উঠে এসেছে এই তথ্য। রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ভারতে জিরো-ডোজ শিশুর সংখ্যা ছিল ৯ লক্ষ ৯ হাজার। এক বছরের ব্যবধানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬ লক্ষ ৭৯ হাজারে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হল, ২০২৩ সালে এ সংখ্যা ছিল ১৫ লক্ষ ৯২ হাজার। অর্থাৎ মাত্র দু–বছরে প্রায় ৯ লক্ষ শিশু টিকাকরণের আওতায় এসেছে। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের দাবি, গত এক দশকে দেশের বিস্তৃত টিকাকরণ কর্মসূচির সাফল্যেরই প্রতিফলন এ পরিসংখ্যান। এই প্রথম বার ভারত আর হামের টিকা না-পাওয়া শিশুর সংখ্যার নিরিখে বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় নেই। প্রশাসনের মতে, সর্বজনীন টিকাকরণের লক্ষ্যপূরণে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
এ সাফল্যের পিছনে রয়েছে শহুরে বস্তি, পরিযায়ী শ্রমিক পরিবার, দুর্গম অঞ্চল এবং টিকা নিয়ে সংশয় থাকা সম্প্রদায়গুলির মধ্যে বিশেষ অভিযান। স্বাস্থ্যকর্তাদের দাবি, ধারাবাহিক কর্মসূচির ফলে বর্তমানে দেশের ৯৫ শতাংশ শিশু ডিটিপি (ডিফথেরিয়া, টিটেনাস ও পার্টুসিস) এবং হাম প্রতিরোধী টিকার সম্পূর্ণ সুরক্ষা পাচ্ছে। ভারত খানিক এগোলেও, বৈশ্বিক চিত্র এখনো পুরোপুরি আশাব্যঞ্জক নয়। রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১১ কোটি ৬০ লক্ষ শিশু ডিটিপি টিকার অন্তত একটি ডোজ পেয়েছে এবং ১১ কোটি শিশু তিনটি ডোজই সম্পূর্ণ করেছে। আগের বছরের তুলনায় সামান্য উন্নতি হলেও এ হার এখনও কোভিড-পূর্ব ২০১৯ সালের স্তরের নীচেই। সবচেয়ে বডড়ো উদ্বেগের জায়গা ‘জিরো-ডোজ’ শিশুদের সংখ্যা। ২০২৫ সালে বিশ্বের ১ কোটি ৩৫ লক্ষ শিশু জীবনের প্রথম বছরে কোনো টিকাই পায়নি। যদিও আগের বছরের তুলনায় এ সংখ্যা কমেছে, কিন্তু নতুন সমস্যা হয়ে উঠেছে ‘ড্রপ-আউট’ শিশু। অর্থাৎ, যারা টিকাকরণ শুরু করলেও নির্ধারিত সব ডোজ শেষ করছে না।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রায় ৭৩ লক্ষ শিশু ডিটিপি-র প্রথম ডোজ নেওয়ার পর হামের প্রথম ডোজ নেওয়ার আগেই কর্মসূচি থেকে বাদ পড়েছে। ফলে হামের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় ৯৫ শতাংশ কভারেজ থেকে বিশ্ব এখনো অনেক দূরে। বর্তমানে হামের প্রথম ডোজ পেয়েছে ৮৪ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছে ৭৭ শতাংশ শিশু। এর ফলেই ২০২৫ সালে ৫৭টি দেশে বড়ো আকারের হাম-প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছে। ইউনিসেফের নির্বাহী অধিকর্তা ক্যাথরিন রাসেল বলেছেন, ‘কোভিড অতিমারির ধাক্কার পর বিশ্বজুড়ে টিকাকরণের হার ফের বাড়তে শুরু করেছে। কিন্তু সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি এবং দারিদ্র্যের কারণে এখনো লক্ষ লক্ষ শিশু সুরক্ষার বাইরে রয়ে যাচ্ছে। এমন কোনো রোগে কোনো শিশুর মৃত্যু হওয়া উচিত নয়, যা একটি সাধারণ টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব।’
একই সুর ‘হু’-র মহাপরিচালক টেড্রস আধানম গেব্রেয়েসুসের গলায়। তাঁর মতে, ‘টিকাকরণ বিশ্বের সবচেয়ে কার্যকর, সাশ্রয়ী ও ন্যায়সঙ্গত জনস্বাস্থ্য উদ্যোগগুলির অন্যতম। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে প্রত্যেক শিশুরই এই সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে।’ রিপোর্টে আরও দেখা গিয়েছে, ২০১৯ সাল থেকে ১০০টি দেশ ডিটিপি টিকার তিন ডোজের ক্ষেত্রে অন্তত ৯০ শতাংশ কভারেজ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু সে তালিকায় নতুন দেশ যুক্ত হওয়ার গতি অত্যন্ত ধীর। ৬৫টি দেশ এখনো স্থবির বা পিছিয়ে রয়েছে। এর মধ্যে অনেক দেশই সংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় জর্জরিত।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পারফরম্যান্স বিশেষ ভাবে নজর কেড়েছে। ২০১৯ সালের তুলনায় এ অঞ্চল শুধু ঘুরে দাঁড়ায়নি, বরং বিশ্বের সর্বোচ্চ কভারেজ অর্জন করেছে। ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল-সহ একাধিক দেশের টিকাকরণ কর্মসূচির সাফল্যই এর পিছনে বড়ো কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা। এদিকে ভারতের টিকাকরণ কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও নতুন গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। নটর ডেম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ সন্তোষ কুমার গৌতমের গবেষণা জানাচ্ছে, ১৯৮৫ সালে চালু হওয়া ‘ইউনিভার্সাল ইমিউনাইজেশন প্রোগ্রাম’ দেশে শিশু মৃত্যুহার কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। প্রায় ৯ লক্ষ শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষক দেখেছেন, এই কর্মসূচির ফলে শিশুমৃত্যুর হার ০.৪ শতাংশ পয়েন্ট এবং পাঁচ বছরের নীচে মৃত্যুহার ০.৫ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে। বিশেষত গ্রামীণ এলাকা, দরিদ্র পরিবার এবং ঐতিহাসিক ভাবে বঞ্চিত সম্প্রদায়গুলির শিশুদের মধ্যে এই সুফল সবচেয়ে বেশি দেখা গিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের সাম্প্রতিক সাফল্য নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। কিন্তু কয়েক লক্ষ শিশুর এখনো টিকাকরণের আওতার বাইরে থেকে যাওয়া মনে করিয়ে দিচ্ছে, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসুরক্ষার লক্ষ্যপূরণে পথ এখনও অনেকটা বাকি। যত দিন না শেষ শিশুটিও টিকার সুরক্ষা পাচ্ছে, তত দিন এই লড়াই শেষ নয়।
❤ Support Us








