- এই মুহূর্তে বি। দে । শ
- জুলাই ২০, ২০২৬
হরমুজ ঘিরে আরও তীব্র যুদ্ধের আগুন ! উপসাগরীয় মিত্রদের উপর তেহরানের আঘাত, ইরানে পাল্টা হামলা মার্কিন বিমান বাহিনীর
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধবিরতির ক্ষীণ আশাও কার্যত ভেঙে পড়ল। ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বিমান হামলা চালানোর কথা ঘোষণা করল যুক্তরাষ্ট্র। প্রায় একই সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের পাল্টা হামলার জেরে কুয়েত, বাহরাইন-সহ একাধিক দেশ সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করতে বাধ্য হয়েছে। কুয়েত জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা ইরানি ড্রোন প্রতিহত করতে সক্রিয় হয়েছে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। বাহরাইনেও মুহুর্মুহু বেজে উঠেছে সাইরেন। নাগরিকদের অবিলম্বে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সে দেশের প্রশাসন। হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া সংঘাত এখন কেবল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; গোটা উপসাগরীয় অঞ্চলই ক্রমশ বৃহত্তর যুদ্ধের আবর্তে জড়িয়ে পড়ছে।
সোমবার সকালে, পশ্চিম এশিয়ায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ‘মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড’ (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানায়, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ ও বেসামরিক নৌপরিবহণের উপর ইরানের হামলার সক্ষমতা ভেঙে দিতেই নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু হয়েছে। মার্কিন বাহিনীর দাবি, এ অভিযানের লক্ষ্য ইরানের উপকূলীয় নজরদারি ব্যবস্থা, আকাশ প্রতিরক্ষা কেন্দ্র, নৌঘাঁটি, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মজুতঘর এবং ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস’ (আইআরজিসি)-র সামরিক অবকাঠামোকে দুর্বল করে দেওয়া। যদিও কোন কোন এলাকায় হামলা হয়েছে বা কতখানি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি ওয়াশিংটন। তবে ইরানের সংবাদমাধ্যম ‘তাসনিম’ জানিয়েছে, সোমবার ভোরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে একাধিক শহর। তাবরিজ, চাবাহার, কোনারাক, বন্দর মাহশাহর এবং বন্দর ইমাম খোমেইনি এলাকায় মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে দাবি করেছে তারা। একই সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের সিরিক এলাকাতেও হামলার খবর দিয়েছে ইরানি সংবাদমাধ্যম। যদিও তেহরানের দাবি, ওই হামলায় উল্লেখযোগ্য প্রাণহানি বা পরিকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
রবিবার ভোর থেকেই নতুন করে এ অভিযান শুরু হয়েছিল বলে জানিয়েছে ‘সেন্টকম’। তাদের বক্তব্য, হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য যাতে নির্বিঘ্নে চলতে পারে এবং ইরান যাতে আর কোনো বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালাতে না পারে, সে লক্ষ্যেই মার্কিন অভিযান চলছে। একই সঙ্গে জর্ডনে মার্কিন সেনাদের উপর হামলার জন্য দায়ী ‘আইআরজিসি’-কে দ্রুত শাস্তি দেওয়াও অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশেই এ হামলা চলছে বলেও স্পষ্ট করেছে সেন্টকম। রবিবার ট্রাম্প জানান, নিহত মার্কিন সেনাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন করে সংঘর্ষের আবহ আরও ঘনীভূত হয়েছে মার্কিন সেনা হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে। এর আগে জর্ডনে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় দুই মার্কিন সেনার মৃত্যু হয়েছিল। রবিবার সেন্টকম জানায়, উত্তর ইরাকে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ড্রোন হামলায় আরও এক সেনার মৃত্যু হয়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মোট নিহত মার্কিন সেনার সংখ্যা ১৭ বলে জানিয়েছে ‘রয়টার্স’। আহত হয়েছেন ৪২০ জনেরও বেশি সেনা। আরও এক সেনা এখনো নিখোঁজ বলে জানিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। ইরানের ক্ষয়ক্ষতি অবশ্য আরও বেশি। তেহরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রকের দাবি, সাম্প্রতিক মার্কিন হামলায় অন্তত ৫০ জন নিহত হয়েছেন এবং ৫০০-রও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। যদিও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের।
অন্যদিকে, মার্কিন হামলার বিরুদ্ধে ইরানও পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ অব্যাহত রেখেছে। ‘আইআরজিসি’ দাবি করেছে, সিরিয়ার আল-তানফ অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন বিশেষ অভিযানের একটি ‘কমান্ড সেন্টার’-এ আচমকা হামলা চালানো হয়েছে। পাশাপাশি কুয়েতে অবস্থিত দুটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতেও হামলার কথা জানিয়েছে তেহরান। ইরানের অভিযোগ, কুয়েত, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, জর্ডন, ওমান এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির বিভিন্ন সেনাঘাঁটি ব্যবহার করেই ইরানে হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। সে কারণেই ওই দেশগুলিও এখন ইরানের পাল্টা আঘাতের লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে। সোমবার ভোরে কুয়েত সেনাবাহিনী জানায়, ইরানের ড্রোন হামলার জেরে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ সক্রিয় রয়েছে। বাহরাইনেও দেশজুড়ে বিমান হামলার সাইরেন বাজানো হয়েছে। সাধারণ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জর্ডনও জানিয়েছে, তারা একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে।
শুধু সামরিক ঘাঁটি নয়, অসামরিক পরিকাঠামোও ক্রমশ এই সংঘর্ষের কেন্দ্রে চলে আসছে। কুয়েত জানিয়েছে, টানা দ্বিতীয় দিনের জন্য তাদের একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র এবং সমুদ্রের জল বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রে হামলা হয়েছে। বিস্ফোরণের জেরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে। যদিও জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড এখনো সচল রয়েছে বলে দাবি করেছে সে দেশের জল ও নবীকরণযোগ্য শক্তি মন্ত্রক। উল্লেখযোগ্যভাবে, কুয়েতের পানীয় জলের প্রায় ৯০ শতাংশই সমুদ্রের জল বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলির উপর নির্ভরশীল। ফলে এ ধরনের হামলা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকেও সরাসরি বিপর্যস্ত করছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, কুয়েত ও বাহরাইনের উপর হামলার মাধ্যমে কার্যত উপসাগরীয় প্রায় সব মার্কিন মিত্র দেশকে কঠিন বার্তা দিতে চাইছে তেহরান। এর আগে জর্ডন-সহ পারস্য উপসাগরের একাধিক দেশ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়েছে। যদিও গত এক সপ্তাহে ইরান সরাসরি ইজরায়েলকে লক্ষ্য করে কোনও হামলা চালায়নি। বর্তমান সংঘর্ষে ইজরায়েলও সরাসরি সামরিক ভূমিকা নেয়নি। তবে সংযুক্ত আরব আমিরশাহিকেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। ‘রেভলিউশনারি গার্ড’-ঘনিষ্ঠ ‘ফার্স’ সংবাদসংস্থা জানিয়েছে, ইরানের অসামরিক পরিকাঠামোর উপর হামলা অব্যাহত থাকলে দুবাই ও আবুধাবির বিমানবন্দর, ফুজাইরাহ এবং জেবেল আলি বন্দর অবিলম্বে খালি করে দেওয়া উচিত। এ হুমকির পর আমিরশাহি বিদেশ মন্ত্রক সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে বলেছে, গোটা অঞ্চলকে আরও ভয়াবহ সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দেওয়ার মতো কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত নয়।
উল্লেখ্য, বিশ্বের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ শান্তিকালীন সময়ে হরমুজ জলপথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত ও ছড়িয়ে পড়ার কারণে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে উদ্বেগও বাড়ছে। ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই হরমুজ প্রণালী কার্যত অবরুদ্ধ করে রেখেছে ইরান। অতীতে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হতো। যুদ্ধের শুরু থেকেই তেহরান একদিকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও মিত্র দেশগুলিকে নিশানা করেছে, অন্যদিকে হরমুজকে কূটনৈতিক চাপের অন্যতম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। পাল্টা যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বন্দরগুলির উপর নৌ অবরোধ পুনর্বহাল করেছে, যাতে দেশটির অপরিশোধিত তেল রফতানি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। রবিবার ইরানের ‘রেভলিউশনারি গার্ড’ দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালী অতিক্রমের চেষ্টা করা চারটি জাহাজের মধ্যে দুটিকে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের অভিযোগ, মার্কিন মদতে ওই জাহাজগুলি ‘অনিরাপদ পথ’ ব্যবহার করে প্রণালী অতিক্রমের চেষ্টা করছিল। দুটি জাহাজ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে থেমে যায় এবং বাকি দুটি ফিরে যেতে বাধ্য হয় বলেও দাবি করেছে ‘আইআরজিসি’।
নতুন করে যুদ্ধের ঘনঘটায় রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাও দ্রুত ক্ষীণ হয়ে আসছে। গত মাসে ইরান-আমেরিকার মধ্যে যুদ্ধবিরতির যে অন্তর্বর্তী সমঝোতা হয়েছিল, তা কার্যত ভেঙে পড়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। ওই সমঝোতা স্মারকে ৬০ দিনের সংঘর্ষবিরতির কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা করেন, যুদ্ধবিরতি কার্যত শেষ। যদিও আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলেও তিনি জানান। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেই অবশ্য সমঝোতাকেই প্রকাশ্যে প্রশ্নের মুখে তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, ট্রাম্পের স্বাক্ষরের কোনো মূল্য বা বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রই বারবার সমঝোতার শর্ত লঙ্ঘন করেছে। ফেব্রুয়ারিতে আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ অভিযানে আয়াতোল্লা আলি খামেনেই নিহত হওয়ার পর মোজতবাকে সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করা হলেও তিনি এখনো প্রকাশ্যে আসেননি। স্বাস্থ্য নিয়ে জল্পনার মধ্যেই অন্তরাল থেকে বিবৃতি জারি করে তিনি বলেছেন, ‘আমেরিকান শত্রুরা যদি আগ্রাসন চালিয়ে যায়, তবে তাদের এমন শিক্ষা দেওয়া হবে যা তারা কোনো দিন ভুলতে পারবে না।’ মোজতবার আরও অভিযোগ, সমঝোতা চুক্তির পরও মার্কিন হামলায় ইরানের অন্তত ৫০ জন নাগরিক নিহত হয়েছেন, ৫ শতাধিক আহত হয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে সমঝোতা স্মারকের প্রতি নিজেদের দায়বদ্ধতা আপাতত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তেহরান। তাঁর দাবি, জবরদস্তি, সর্বগ্রাসী আগ্রাসন এবং বর্বরতাই মার্কিন নীতির প্রকৃত পরিচয়। ইরানের কেন্দ্রীয় সামরিক বাহিনীর কমান্ডার আলি আবদোল্লাহিও সতর্ক করে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র আরও হামলা চালালে তার উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে। একই ধরনের ভাষায় বিবৃতি দিয়েছে সে দেশের যৌথ সামরিক কমান্ডও।
অন্যদিকে, ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থা অভিযোগ করেছে, দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানে নির্মীয়মাণ ডারখোভিন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ এলাকাতেও হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে এই হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে তেহরান। তবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, সর্বশেষ পরিদর্শনের সময় ওই প্রকল্পে কোনো পারমাণবিক উপাদান ছিল না। সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি সব পক্ষকেই পারমাণবিক স্থাপনার আশপাশে সামরিক সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি এখন আর কেবল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র বা ইজরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে গোটা উপসাগরীয় অঞ্চল ক্রমশ বৃহত্তর সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে। অসামরিক পরিকাঠামো, বিদ্যুৎকেন্দ্র, জল বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট, বন্দর ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলা পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির উপরও এই সংঘাতের প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
❤ Support Us








