Advertisement
  • ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
  • জুলাই ১৩, ২০২৫

হিরণবালা । পর্ব ১২

দাদার চিঠিটা এসে হিরণের মন কেমন যেন পাথরের মতো নির্জীব করে দিয়েছিল। দাদা নিজে এসে সেই মনকে কিন্তু জাগিয়ে দিল আবার। হিরণের মনে হচ্ছে ওর মনগাছের গোড়ায় দাদা যেন মালির মতো ঝাঁজরি করে জল নয় অনেকখানি স্বপ্ন ঢেলে দিয়েছে...তারপর

অংশুমান কর
হিরণবালা । পর্ব ১২

 
১৯

 
এক রকম প্ল্যান করছিল হিরণ। হয়ে গেল উলটো রকম। সত্যিই মানুষ ভাবে এক আর হয় আর এক ! কাঁথি থেকে বেলিয়াতোড়ে আসার সময় হিরণ কি কখনও ভেবেছিল যে বছর না পুরতেই ওকে বদলি করে দেওয়া হবে গড়বেতায় ? কিন্তু তাই হল। 
 
গড়বেতা বেলেতোড়ের মতোই গঞ্জ। বাঁকুড়া থেকে খুব দূরে নয় কিন্তু পড়ছে মেদিনীপুর জেলায়। তবে এ মেদিনীপুর কাঁথির মেদিনীপুর নয়। বাঁকুড়ার মতোই মেদিনীপুরের এই অংশটাও রুক্ষ, শুষ্ক। বেলিয়াতোড়ের সঙ্গে প্রকৃতির খুব একটা তফাৎ এখানে খুঁজে পায় না হিরণ। মাটির রং বেলিয়াতোড়ে ছিল আরও বেশি লাল। 
 
হিরণ ভাবে, ছেড়ে এসে ওর জীবন অনেকটা ভবঘুরের মতো হয়ে যাচ্ছে। এক জায়গায় তো কাল আরেক জায়গায়। তবে এই সমস্ত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার নামই তো জীবন। আর একটা কথা ইতিমধ্যেই হিরণ বুঝেছে। এক জায়গায় থিতু হলে মজা পুকুরের ঘাটে শ্যাওলা জমার মতো জীবনেও শ্যাওলা জমে যায়। জীবনে চলাচল ভালো। 
 
সত্যকে দাদা নিয়ে চলে গেছে হাওড়ায়। গোবিন্দকে গড়বেতা এনে আবার স্কুলে ভরতি করতে হয়েছে হিরণকে। গীতার পড়াশোনার পাট চুকে গেছে ইতিমধ্যেই। উনিশ বছরের গীতা এখন রীতিমতো যুবতি। ঘরের কাজে গীতা হিরণকে অনেকখানি সাহায্য করে। মেয়েটার রান্নার হাত হয়েছে চমৎকার। গোবিন্দর দেখা শোনাও অনেকখানি করে গীতা। এদিক থেকে দেখতে গেলে হিরণ এখন অনেকখানি চিন্তা মুক্ত। হিরণের এখন একটাই চিন্তা। তার জন্য একজন ভালো পাত্র পাওয়া। গীতার বিয়ে দেওয়াই এখন হিরণের প্রধান কাজ। 
 

হিরণ দেখল  উদ্বাস্তুদের অন্তহীন স্রোত আছড়ে পড়ছে এ-বাংলার বুকে। অনেক ছোটোবেলায় এক জাদুকর এক জাদু দেখিয়েছিল। একটা ছোট্ট ঘট থেকে জল ফেলেই চলেছে, ফেলেই চলেছে–শেষ আর হয় না। এ বাংলায় উদ্ভাস্তুদের স্রোত যেন অনেকটা সেরকমই। মনে হচ্ছে শেষ হবে, কিন্তু শেষ আর হচ্ছে না

 
তার সম্বন্ধ নিয়ে একজন ঘটক প্রায়ই আনাগোনা করছে হিরণের কাছে। তার নাম সুরেন গোঁসাই। পুরো নাম সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামী। তবে লোকের মুখে মুখে তার নাম হয়ে গেছে সুরেন গোঁসাই। সারাদিন পান খায়। দুটো কথা বলার পরই লাল থুতু ফেলে। হিরণের গা ঘিনঘিন করে ওঠে। এই লোকটাকে একেবারেই পছন্দ করে না গীতা। হিরণ বোঝে গীতা এক্ষুনি বিয়ে করতে চায় না। দু-দিন  বাড়িতেই চলে এসেছিল সুরেন গোঁসাই। তাতে গীতা বেশ রাগ করেছিল। খানিকটা বুঝতে পেরেই এখন সুরেন গোঁসাই সরাসরি হাসপাতালেই চলে আসে। 
 
আজও এসেছে সুরেন গোঁসাই। সকালের দিকের ভিড়টা এখন হাসপাতালে নেই। হিরণ বসে বসে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস “কবি” পড়ছিল। এই উপন্যাসের নায়ক নিতাইচরণের মাঝে হিরণ ওর মানুষটাকে অনেকখানি খুঁজে পাচ্ছে। পড়তে পড়তে কেমন ঘোর লেগে গিয়েছিল হিরণের। খেয়ালই করেনি কখন এসে ওর পাশের টুলে বসে পড়েছে সুরেন গোঁসাই। সম্বিত ফিরল সুরেন গোঁসাইয়ের কথায়। সুরেন গোঁসাই বলল, দিদি একখান কথা ছিল। 
 
বই থেকে মুখ তুলে হিরণ বলল, কন। 
 
সুরেন গোঁসাই বলল, এবারের পাত্র আগের বারের চেয়ে অনেক ভালো। মেদিনীপুর শহরে বনেদী ব্যবসা। চার পুরুষের ব্যবসা। পাত্র ছোটো ছেলে। দুই দিদি। দু-জনেরই বিয়ে হয়ে গেছে। এক জা নিয়ে ঘর করতে হবে। ছেলের বয়স মাত্র তিরিশ। সুপুরুষ। দেখুন, ছবি দেখলেই আপনার পছন্দ হয়ে যাবে। 
 
বলেই ব্যাগ থেকে ছবি বের করল সুরেন গোঁসাই। 
 
হিরণ দেখল ছেলেটিকে দেখতে খারাপ নয়। আগের তিনটি পাত্রকে নানা কারণে হিরণ নাকচ করে দিয়েছিল। প্রথমজন ছিল দোজবরে। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় জন দেখতে একেবারেই ভালো ছিল না। আর গীতা সুন্দরী। অসুন্দর কোনো পুরুষের হাতে মেয়েকে তুলে দেবে কেন হিরণ। হোক না গীতার বাবা নেই। কিন্তু হিরণ নিজে তো সরকারি চাকরি করে। সরকারি চাকরিওলা কোনো পাত্রকেই পছন্দ করবে হিরণ। ও সুরেন গোঁসাইকে বলল, শোনেন ভাই, ব্যবসায়ী পাত্রর লগে মেয়ের বিয়া দিমু না। 
 
সুরেন গোঁসাই বলল, সরকারি চাকরির বড়ো আকাল দিদিমণি। দেশ সবে স্বাধীন হয়েছে। এখনই সরকারি চাকরিওলা পাত্র আপনি পাবেন কোথায়?
 
সরকারি চাকরির যে আকাল, তা হিরণ জানে। কিন্তু ব্যবসায়ী পরিবারে হিরণ গীতাকে তুলে দেবে না। ওর নিজেরও তো বিয়ে হয়েছিল ব্যবসায়ী পরিবারেই। ওর মেয়েরও ওর মতোই দশা হোক তা হিরণ একেবারেই চায় না। 
 
ও বলল, সরকারি চাকরির আকাল তা জানি। কিন্তু ব্যবসায়ী পরিবারের মেয়ে দিমু না। আপনে অন্য পাত্র খোঁজেন। 
 
গজগজ করতে করতে সুরেন গোঁসাই বেরিয়ে গেল।
 

২০

 
ট্রেন শিয়ালদা স্টেশনে থামলে হিরণ দেখল স্টেশন চত্বরেই বাক্সপ্যাঁটরা নিয়ে সংসার পেতেছে একাধিক উদ্বাস্তু পরিবার। উদ্বাস্তুদের অন্তহীন স্রোত আছড়ে পড়ছে এ-বাংলার বুকে। অনেক ছোটোবেলায় এক জাদুকর এক জাদু দেখিয়েছিল। একটা ছোট্ট ঘট থেকে জল ফেলেই চলেছে, ফেলেই চলেছে–শেষ আর হয় না। এ বাংলায় উদ্ভাস্তুদের স্রোত যেন অনেকটা সেরকমই। মনে হচ্ছে শেষ হবে, কিন্তু শেষ আর হচ্ছে না। হিরণ দেখল, উদ্বাস্তু পরিবারগুলির অনেকেই সারিবদ্ধ হয়ে পুলিশের খাতায় নিজেদের নাম নথিভুক্ত করছে। ও বুঝতে পারে এখান থেকেই এই মানুষগুলো চলে যাবে নানা ক্যাম্পে। সারা বাংলা জুড়ে নানা জায়গায় উদ্বাস্তুদের জন্য এরকম ক্যাম্প খুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী বিধান রায়। সেরকম একটা ক্যাম্পেই লাবণ্যরা আছে। ক্যাম্পটার নাম কুপার্স ক্যাম্প। সেখানেই আজ হিরণ চলেছে গোবিন্দ আর গীতাকে নিয়ে। 
 

অপ্রশস্ত সরু সরু গলির দু-পাশে খুপরি খুপরি ঘর নিয়ে কুপার্স ক্যাম্প। একেকটি পরিবারের জন্য এক একটি ঘর। কোনো কোনো জায়গায় এক-একটি ঘরেই সাত-আট জন মানুষ। ওদের দেশে এভাবে গোয়ালের মধ্যে গরু-বাছুর একসঙ্গে থাকত। এখানে মানুষ থাকছে। গলিগুলো বেশ নোংরা। এই ক্যাম্পে থাকলে মানুষের সুস্থ থাকাটাই একটা অস্বাভাবিক ঘটনা, হিরণ বেশ বুঝতে পারে

 
লাবণ্যর খবরটা হিরণকে এনে দিয়েছিল সুরেন গোঁসাই। লোকটা বিরক্তিকর, কিন্তু কাজের। ঘটকগিরি করার জন্য সারা পশ্চিমবঙ্গ লোকটা ঘুরে বেড়ায়। নানা খবরাখবর থাকে ওর ঝুলিতে। ওই প্রথম হিরণকে জানায় যে, কুপার্স ক্যাম্পে সম্ভবত লাবণ্যরা আছে। লাবণ্যর যে বর্ণনা দিয়েছিল সুরেন গোঁসাই তাতে হিরণেরও মনে হয়েছিল যে, যার কথা সুরেন গোঁসাই বলছিল, সে লাবণ্যই। তারপর সুরেন গোঁসাই নিয়ে আসে লাবণ্যর ছোট্ট চিঠি। সেই চিঠি থেকেই হিরণ জানতে পারে, দুই মেয়ে আর বরকে নিয়ে বর্ডার পেরিয়ে চলে এসেছে লাবণ্য। দিদি বিজলীবালা অবশ্য রয়ে গেছে ঢাকা শহরেই। দিদিদের অগাধ সম্পত্তি। এখনই ঢাকা শহর ছাড়ার প্রয়োজন নেই। লাবণ্যর বর অনন্তলাল মাতাল মানুষ। সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল। তার ওপর প্রতি মুহূর্তে দাঙ্গার আতঙ্ক। সীমানা পেরিয়ে এদেশে এসে লাবণ্য তাই দুই মেয়ে আর বরকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে কুপার্স ক্যাম্পে। কুপার্স ক্যাম্প রানাঘাটে। শিয়ালদা স্টেশন থেকে রানাঘাট যাওয়ার ট্রেন ধরবে হিরণ। দাদাকেও হিরণ জানিয়েছে লাবণ্যর কথা। সে চিঠি দাদা এখনও পেয়েছে কি না হিরণ অবশ্য জানে না। 
 
ক্যাম্পের জীবন যে কেমন হতে পারে সে সম্পর্কে কোনো ধারনাই ছিল না হিরণের। ও দেশ ছেড়েছে এসে উঠেছিল দাদার বাড়িতে। তারপর বর্ধমানের নার্সিং হোস্টেলে। তারপর থেকে হাসপাতালের কোয়াটার্সেই কেটেছে ওর জীবন। কুপার্স ক্যাম্পে টিনের ছাউনি দেওয়া ঘরে লাবণ্যর মুখোমুখি বসে ভয়ে, লজ্জায় ও কুঁকড়ে গেল। ওর এতদিন দু:খ ছিল নিজের জীবন নিয়ে। লাবণ্যকে দেখে ওর মনে হল ও নিজে ভালো আছে, অনেক ভালো আছে। 
 
অপ্রশস্ত সরু সরু গলির দু-পাশে খুপরি খুপরি ঘর নিয়ে কুপার্স ক্যাম্প। একেকটি পরিবারের জন্য এক একটি ঘর। কোনো কোনো জায়গায় এক-একটি ঘরেই সাত-আট জন মানুষ। ওদের দেশে এভাবে গোয়ালের মধ্যে গরু-বাছুর একসঙ্গে থাকত। এখানে মানুষ থাকছে। গলিগুলো বেশ নোংরা। এই ক্যাম্পে থাকলে মানুষের সুস্থ থাকাটাই একটা অস্বাভাবিক ঘটনা, হিরণ বেশ বুঝতে পারে। 
 
হিরণ, গীতা আর গোবিন্দকে দেখে লাবণ্যর কান্না তো থামেই না। হিরণেরও চোখ ছল ছল করে উঠল। কিন্তু ও কাঁদল না। অল্পতেই চোখের জল ফেলা বন্ধ করেছে হিরণ। বোনের পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে হিরণ বলল, তোগো এহানে চলে কী কইর‍্যা?
 
লাবণ্য বলল, র‍্যাশনের চাইল-ডাইল দ্যায়। সামান্য ট্যাহা দেয়। চইল্যা যায় কোনোরকমে। ও ভাবতাছে একখান দোকান দিব। 
 
ভ্যাবলার মতো বসে আছে অনন্তলাল। দেখে মনে হচ্ছে চুরির আসামী। হিরণ ভাবে, দোকান দিয়ে ব্যবসা সামলাতে পারবে নাকি অনন্ত লাল? তাও নতুন এই দেশে? 
 
ও অনন্তলালকে জিজ্ঞেস করল, কীসের দোকান দিবা? 
 
দু-চোখে অনন্ত জিজ্ঞাসা নিয়ে অনন্তলাল বলল, কিসুই ভাবি নাই দিদি। দিমু একখান।
 
হিরণ বুঝতে পারে, ব্যবসা করা অনন্তলালের কম্ম নয়। লাবণ্যর মেয়ে দু-টি ফুটফুটে। হিরণ যখন দেশ ছেড়েছিল তখন মেয়ে দু-টির জন্ম হয়নি। গীতা আর গোবিন্দ ওদের কোলে বসিয়ে আদর করছে। ওরাও কেমন যেন জবুথবু হয়ে আছে। ভয় আর আতঙ্ক থাবা বসিয়েছে দু-টি বাচ্চা মেয়ের চোখেমুখেও। হিরণ ওদের জন্য ব্রিটিশ ক্যাডবেরি কিনে এনেছিল। বাচ্চারা চকলেট পেলে খুশি হয়। কিন্তু লাবণ্যর মেয়ে দু-টি ক্যাডবেরি পেয়েও তেমন খুশি হয়নি। নতুন জায়গা নতুন পরিবেশের সঙ্গে ওরা এখনও পর্যন্ত মানিয়ে নিতেই পারেনি। 
 
একটা দিন কুপার্স ক্যাম্পে লাবণ্যদের সঙ্গে কাটিয়ে ফিরে আসার সময় হিরণের ভালো লাগছিল আবার মনখারাপও করছিল। ভালো লাগছিল এই ভেবে যে, এদেশে এখন দাদা, বোন আর ও নিজে–তিন ভাইবোন একসঙ্গে রয়েছে। ও দেশে পড়ে রইল শুধু দিদি। সেও নিশ্চয়ই কোনো এক সময় এদেশে এসে হাজির হবে। তখন এই দেশটাই হয়ে যাবে ওদের নিজেদের দেশ। এসব ভেবে ওর আনন্দই হচ্ছিল।  আবার মনখারাপও করছিল এ কথা ভেবে যে, ওর মাইনে এতই কম যে, তার থেকে যে প্রতি মাসে কিছু টাকা লাবণ্যকে পাঠিয়ে দেবে, সে সঙ্গতি ওর নেই। তার ওপর সারাক্ষণ মাথায় রয়েছে পাহাড়ের চাপের মতো গীতার একটা ভালো বিয়ে দেওয়ার ভাবনা। হিরণ ভাবল কালই সুরেন গোঁসাইকে ডেকে একটু উঠে-পড়ে লাগার কথা বলতে হবে। 
 

♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦

ক্রমশ..
 
আগের পর্ব পড়ুন: হিরণবালা । পর্ব ১১

হিরণবালা । পর্ব ১১


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!