- ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
- আগস্ট ১০, ২০২৫
হিরণবালা । পর্ব ১৬
চিত্রকর্ম: নীলোৎপল ভট্টাচার্য
২৭
মানুষ জীবনে কী খোঁজে ? এই প্রশ্ন এখন হিরণকে মাঝে মাঝে ভাবায়। ওর মনে আছে ওদেশে যখন মানুষটা ঘর ছেড়ে চলে গিয়েছিল, প্রথম ক-দিন ও খুঁজে বেড়াত ওই মানুষটাকেই। অপেক্ষা করত। ভাবত কোনো একদিন মানুষটা ঠিক ফিরে আসবে। হিরণের জন্য না হোক তার সন্তানদের জন্য মানুষটা ফিরে আসবে। এক সময় সেই খোঁজ হিরণের থেমে গিয়েছিল। ও বুঝেছিল যে, মানুষটা আর ফিরবে না। তখন শুরু হয়েছিল ওর দ্বিতীয় খোঁজ। ও খুঁজে বেড়াচ্ছিল একটা চাকরি। চাকরি অবশ্য বেশিদিন খুঁজতে হয়নি ওকে। পেয়ে গিয়েছিল। তারপর গত কয়েক বছর ধরে খুঁজে বেড়াচ্ছিল গীতার জন্য পাত্র। অবশেষে সেই পাত্রও পেল। এরপর ও কি খুঁজবে ? সত্যর জন্য একটা চাকরি? সেটাই তো এবার চাইছে ও। তাই তো বামাপদর প্রস্তাবটা ওর মাথার মধ্যে ঘুরঘুর করছে। আসলে মানুষের জীবনে খোঁজ কখনও শেষ হয় না। যে-মানুষের জীবনে খোঁজ শেষ হয়ে যায়, হিরণের মনে হয়, সেই মানুষ আসলে মৃত। এক খোঁজ শেষ হয়, তো শুরু হয়ে যায় আর এক খোঁজ।
সংবিধানের নিয়ম কানুন পরিবর্তন করে নাকি নেহেরু এসসি এসটিদের জন্য সংরক্ষণের সময়সীমা বাড়িয়ে কুড়ি বছর করে দিয়েছেন। হিরণের উচিত একটা এসসি সার্টিফিকেটের জন্য আবেদন করা। মেদিনীপুরের ওদিকে নাকি করেরা অনেকেই সিডিউল কাস্ট। এতে সত্য আর গোবিন্দর ভবিষ্যৎ নিয়ে আর তেমন ভাবতেই হবে না হিরণকে। বামাপদ বলেছে হিরণ রাজি হলে বাঁকুড়ার কংগ্রেসের নেতাদের সঙ্গে ও কথা বলতে পারে
গীতার বিয়েটা বেশ ধুমধাম করেই হয়েছে। হিরণ খুব খুশি হয়েছে গোবিন্দর বন্ধুদের গীতার বিয়েটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া দেখে। বিশু, তিতা–কী খাটানিটাই না খেটেছে। বাজারহাট করা থেকে পরিবেশন–সমস্ত কিছুতেই হাত লাগিয়েছিল ছেলেগুলো। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবরা এসেছিল বলেও হিরণ খুব খুশি হয়েছিল। দাদারা সবাই এসেছিল। লাবণ্যরা এসেছিল। বিয়েবাড়িতে এসেও যথারীতি অনন্তলাল অধিকাংশ সময় শুধু গড়িয়ে গড়িয়েই কাটিয়েছিল। হিরণ সবচেয়ে খুশি হয়েছিল কাঁথি থেকে বামাপদ আসায়। ওদেশ থেকে ছিদাম তো আর আসতে পারেনি। সে যে কেমন আছে, তাও হিরণ জানে না। কিন্তু, ওর কাঁথির ছিদাম বামাপদ এসেছিল। বৌভাত মিটে যাওয়ার পরেও দুটো দিন থেকে গিয়েছিল বামাপদ। তখনই বামাপদ ওকে একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছে। বামাপদ বলেছে যে, সংবিধানের নিয়ম কানুন পরিবর্তন করে নাকি জওহরলাল নেহেরু এসসি এসটিদের জন্য যে-রিজার্ভেশন, তার সময়সীমা দশ বছরের চেয়ে বাড়িয়ে কুড়ি বছর করে দিয়েছেন। হিরণের উচিত একটা এসসি সার্টিফিকেটের জন্য আবেদন করা। মেদিনীপুরের ওদিকে নাকি করেরা অনেকেই সিডিউল কাস্ট। এতে সত্য আর গোবিন্দর ভবিষ্যৎ নিয়ে আর তেমন ভাবতেই হবে না হিরণকে। বামাপদ বলেছে হিরণ রাজি হলে বাঁকুড়ার কংগ্রেসের নেতাদের সঙ্গে ও কথা বলতে পারে।
এসসি সার্টিফিকেট বের করতে পারলে সত্যিই সত্য আর গোবিন্দর ভবিষ্যতের জন্য চিন্তা করতে হবে না। দেশ স্বাধীন হয়েছে ঠিক। কিন্তু উন্নতি তেমন হয়নি এখনও। একটা সরকারি চাকরি পাওয়া হয়ে গেছে খুব কঠিন। এজন্যই তো অপেক্ষা করে করে শেষ পর্যন্ত গীতার বিয়ে মনোরঞ্জনের সঙ্গে দিতে হল। একেকবার হিরণের মনে হচ্ছে এপারে এসে যে লড়াই একা হাতে হিরণ এখনও পর্যন্ত করেছে তাতে এই মিথ্যেচারটুকু অন্যায় নয়। ঈশ্বরও তো ওর সঙ্গে সুবিচার করেননি। না হলে মানুষটা ওইভাবে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়! বামাপদর মাধ্যমে হয়তো ভগবানই ওর কাছে ওরকম একটা সুযোগ পাঠিয়ে দিচ্ছেন। সুযোগের সদ্ব্যবহার না করতে পারলে হয়তো ওকে সারা জীবন হাত কামড়াতে হবে। খুবই দ্বিধায় পড়ে গেছে হিরণ। এখানে কার সঙ্গে এই বিষয়ে পরামর্শ করা যেতে পারে সেটাও ও বুঝে উঠতে পারছে না। ডাক্তার শিট খুবই ভালো মানুষ। কিন্তু, হিরণ নিশ্চিত এই বিষয়ে ডাক্তারবাবু ওকে কোনো পরামর্শই দেবেন না। এই ধরনের মুহূর্তগুলোতে হিরণের নিজেকে বড়ো অসহায় লাগে। কী করবে ঠিক করে উঠতে পারে না। একমাত্র যার কাছ থেকে পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে সে দাদা। কিন্তু দাদারা বৌভাতের পরের দিনই হাওড়ায় ফিরে গেছে। দাদারা দুটো দিন থেকে গেলে হয়তো বামাপদর প্রস্তাবটা মুখোমুখি দাদার সঙ্গে ও আলোচনা করে নিতে পারত। হিরণ ঠিক করল দাদাকেই ও একটা চিঠি লিখবে।
২৮
মা বলত, মানুষ ভাবে এক আর হয় আর এক। জীবন দিয়ে ক্রমশ হিরণ বুঝতে পারছে কথাটা কত সত্যি। না চাইতেই যেমন মাঝে মাঝে আশাতীত অনেক কিছু পাওয়া যায়, তেমনই প্রায়ই যা চাওয়া হয়, তা পাওয়াও যায় না। এই যেমন গীতার বিয়ে দেওয়ার সময় হিরণ আশা করেছিল যে, পণ ছাড়া যখন বিয়ে হচ্ছে তখন আনন্দেই থাকবে গীতা। ও তো তখন ভাবেনি যে, বিয়ের দু-মাসের মধ্যেই এইরকম একটা চিঠি লিখবে গীতা।
গীতা লিখেছে:
শ্রীচরণেষু মা,
আমার প্রণাম লইও। আমি এই নূতন বাসায় ভালোই আছি। শাশুড়ি ঠাকুরন ভালো মানুষ। আমাকে বিশেষ কাজ করিতে হয় না। সকালবেলায় তোমার জামাইয়ের ভাত রাঁধিয়া দিই। এখনও ভাত মাঝে মাঝে শক্ত হইতেছে। কতক্ষণ ফুটাইব তাহা ঠিক বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছি না।
আমাদের পাড়াটিও যথেষ্ট ভালো। এখানকার লোকজন বড়ো মিশুকে। সবাই আমাদেরই মতো। আমাদেরই ভাষায় কথা কয়। কথা বলিয়া সুখ আছে।
তোমার জামাইও ভালো মানুষ। তবে রোজগার কম। বুঝিয়া শুনিয়া চলিতে হইবে। অষ্টমঙ্গলায় যাইয়া তোমাকে বলিয়াছিলাম যে, তোমার জামাইকে বলিব সত্যর পড়াশোনার জন্য প্রতিমাসে কিছু সাহায্য করিতে। কিন্তু তাহা সম্ভব হইবে না। যাহা বুঝিয়াছি, সংসার টানাটানি করিয়াই চালাইতে হইবে।
গোবিন্দর দেখাশুনা ঠিকমতো করিও। নিজের শরীরের যত্ন লইও। সত্য আশা করি ঠিক আছে।
আমার প্রণাম লইও।
ইতি,
গীতা।
সুরেন গোঁসাই বলেছিল যে, পাত্র ভালো চাকরি করে। কিন্তু মনোরঞ্জনের মাইনে যে ঠিক কত, সে কথা হিরণ কখনোই সুরেন গোঁসাইকে জিজ্ঞেস করেনি। আর্থিক কষ্টের মধ্যে যে গীতাকে পড়তে হতে পারে, এ-কথা কখনও হিরণের মাথাতেই আসেনি। গীতাও হয়তো ভাবতেই পারেনি যে, টানাটানি করে সংসার চালাতে হবে বিয়ের ঠিক পরে পরেই। জামাইয়ের থেকে আর্থিক সাহায্যের আশা হিরণ কখনোই করেনি। কিন্তু, এইবার ওর ভয় হতে শুরু করেছে যে, গীতার সংসারের দায়িত্বও বুঝি বা ওকেই নিতে হবে!
গোবিন্দর এখনও পড়াশুনো বাকি অনেক। সত্যর কলেজ শেষ হলে বিটি ট্রেনিং নেবে বলছে। তার জন্যও খরচপত্র আছে। সত্য একটা চাকরি পেয়ে গেলে হয়তো হিরণের আর্থিক কষ্ট খানিকটা কমবে। এখন অনেক দূরের ব্যাপার। গীতার বিয়ে দিতে গিয়েই ওকে বেশ খানিকটা ধার করতে হয়েছে। কীভাবে যে সেই টাকা শোধ হবে, কবে শোধ হবে, হিরণ জানে না।
অর্থের অভাবই মানুষকে অনেক সময় ভুল পথে চালিত করে, এ কথাও হিরণ এই ক-দিনে বুঝেছে। তা না হলে বামাপদর প্রস্তাবে ও এমন ভাবে নড়েচড়ে উঠত কেন ? কেন নিজেরা কায়স্থ হওয়া সত্ত্বেও ওর মনে হচ্ছিল একটা সিডিউল কাস্ট সার্টিফিকেট বের করে নিলে হয় ? সে তো কেবলমাত্র ভবিষ্যতে দুই ছেলের আর্থিক নিরাপত্তা ও সুনিশ্চিত করতে চাইছিল বলেই। তবে, অন্যায় কাজটা করার থেকে দাদা ওকে বাঁচিয়েছে। দাদাকে চিঠি লিখে হিরণ জানতে চেয়েছিল বামাপদর প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে ওর কী করা উচিত। দাদা খুব পরিষ্কার করে জানিয়েছিল যে, জীবনে একবার বাঁকা পথে চলতে শুরু করলে আর সোজা পথে হাঁটা যায় না। সিডিউল কাস্ট সার্টিফিকেট জোগাড় করার পরিবর্তে হিরণের উচিত দুই ছেলে পড়াশুনো যাতে মন দিয়ে করে সেটা নিশ্চিত করা। পড়াশুনোই আমাদের মতো মানুষের সবচেয়ে বড়ো সার্টিফিকেট। কথাটা একদমই ভুল বলেনি দাদা। এই ভাবনাই তো হিরণও ভাবত। কিন্তু এই ভাবনা থেকে ওকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল আর্থিক কষ্টই তো। রামকৃষ্ণ বলেছেন ঠিক যে, টাকা মাটি, মাটি টাকা। কিন্তু, অঢেল টাকা মানুষের জীবনে প্রয়োজন না হলেও, স্বাচ্ছন্দ্যে জীবননির্বাহ করার মতো টাকাটুকু মানুষের দরকার। ওই টাকাটুকুই মানুষকে কুকুর-বিড়ালের থেকে আলাদা করে রাখে; মানুষকে শুধু বাইরে নয় অন্তরেও ভিখিরি বানিয়ে দেয় না।
♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦
ক্রমশ..
আগের পর্ব পড়ুন: হিরণবালা । পর্ব ১৫
❤ Support Us








