- ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
- আগস্ট ২৪, ২০২৫
হিরণবালা । পর্ব ১৮
পড়াশোনা আর থাকা-খাওয়ার খরচ নিয়ে যে-খোঁটাটা দাদা দিয়েছে, তা কিছুতেই হিরণের হজম হচ্ছে না । ও মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে, টাকা যেভাবেই হোক ও দাদাকে ফেরত দেবে । তারপর...
৩১
ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায় মারা গেলেন। খবরটা পেয়ে হিরণের মনে হল ওর বুঝি বা আত্মীয় বিয়োগ হল। গত বছরই বিধান রায়কে ভারতরত্ন সম্মান দেওয়া হয়েছিল। খুব খুশি হয়েছিল হিরণ। কেন কে জানে, ওদেশ ছেড়ে আসার পর এদেশে ওর এই যে নবজন্ম হয়েছে, এজন্য ও চিরকালই বিধানচন্দ্র রায়ের কাছে নিজেকে কৃতজ্ঞ মনে করত। যে-গান্ধীজিকে ঈশ্বরের মতো শ্রদ্ধা করে হিরণ, সেই গান্ধীজিরও তো খুবই স্নেহের পাত্র ছিলেন বিধানচন্দ্র রায়।
কাঁথি হাসপাতলে থাকার সময় থেকেই বিধানচন্দ্র রায়কে নিয়ে কতই না গল্পকথা হিরণ শুনেছে ! শুনেছে যে, ডাক্তার হিসেবে বিধানচন্দ্র রায় ছিলেন ধন্বন্তরি। একজন মানুষকে দূর থেকে দেখেই নাকি তিনি বলে দিতে পারতেন কী রোগ হয়েছে মানুষটির। অবশ্য শুধুই একজন ডাক্তার ছিলেন না বিধান রায়। ওর মতো এমন মানবিক ডাক্তারবাবুও কমই দেখেছে হিরণ। বিধানচন্দ্র রায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে বহুবার শোনা একটা গল্প মনে পড়ে গেল হিরণের। মহাকারণে পাঁচটার পর আর কাউকেই তেমন থাকতে দিতেন না বিধান রায়। অফিস ছুটি হয়ে যাওয়ার পরে রাত প্রায় আটটা পর্যন্ত বসে একের পর এক ফাইল সই করতেন উনি। সঙ্গে থাকতেন কেবল ওঁর পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট আর একজন সার্জেন্ট যিনি ওঁকে গাড়িতে তুলে দিতেন।
একদিন মহাকরণ থেকে রাত্রি নটা নাগাদ বেরোবার সময় উনি শুনতে পান তিন তলায় এক সাফাই কর্মী ঝাঁট দিচ্ছে আর কাশছে। কাশির শব্দ শুনে উনি ওর পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্টকে বলেছিলেন, লোকটিকে তক্ষুনি ওঁর গাড়ি করে যেন যাদবপুরের টিবি হাসপাতালে ভরতি করা হয়। লোকটির গ্যালপিং টিবি হয়েছে।
লোকটিকে হাসপাতালে ভরতি করা হলে দেখা যায় সত্যিই ওর গ্যালপিং টিবি হয়েছে। বিধানচন্দ্র রায় এরপর ওই সাফাই কর্মীর সুস্থ হওয়া পর্যন্ত সবেতন ছুটি মঞ্জুর করেছিলেন। সচিব নাকি ওঁকে বলেছিলেন, এটা হয় না, নিয়মে আটকায়। শুনে সচিবের কাছ থেকে ফাইল কেড়ে নিয়ে নিজেই ফাইলে সই করে অসুস্থ সাফাই কর্মীটির ছুটি মঞ্জুর করে দিয়েছিলেন বিধানচন্দ্র রায়।
এমন মানুষ চলে গেলে হিরণের মনখারাপ হওয়া তো স্বাভাবিক। কিন্তু, বিধানচন্দ্র রায়ের মৃত্যুতে হিরণ দেখল পুরো পশ্চিমবঙ্গই যেন শোকে আচ্ছন্ন। তারও কারণ আছে। প্রবল অর্থসংকটের মধ্যেও রাজ্যটাকে গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন বিধানচন্দ্র রায়। চারটে নতুন শহর তৈরি করেছেন তিনি। বানিয়েছেন দুর্গাপুর, কল্যাণী, সল্টলেক আর এখন যেখানে লাবণ্যরা আছে সেই অশোকনগর-কল্যাণগড়। এইরকম একজন মানুষের প্রয়াণে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের তো মনে হবেই আত্মীয় বিয়োগ হল।
হিরণ দেখল বিধানচন্দ্র রায়ের মৃত্যুতে ওরই মতো অনেকখানি ভেঙে পড়েছে সত্যও। ইতিহাসে অনার্স নিয়ে সত্য বিএ পাস করেছে। এখন পড়ছে বাণীপুর বিটি ট্রেনিং কলেজে। এই কলেজে কী করে স্কুলের বাচ্চাদের পড়াতে হয় তা শেখানো হয়। বিটি ট্রেনিং নেওয়া থাকলে স্কুলের চাকরি পেতে সুবিধে হয় বলেই সত্য এই কলেজে ভরতি হয়েছে। প্রথমদিকে রাজনীতির ব্যাপারে সত্যর একেবারেই আগ্রহ ছিল না। কলকাতার কলেজে পড়ার সময় থেকেই আস্তে আস্তে রাজনীতির ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠতে থাকে সত্য। মাঝে মাঝে হিরণের সঙ্গে এসব বিষয় নিয়ে কথাও বলে। হিরণের মতোই সত্যও গান্ধীজি আর বিধান রায়ের ভক্ত। তাই এই মৃত্যুতে সত্যও ভেঙে পড়েছে অনেকখানি। বিধানচন্দ্র রায়ের মৃত্যুর খবর পাবার পরই ও হিরণকে বলল, জানি না বিটি ট্রেনিং করে আর কোনো লাভ হবে কি না। বিধান রায় না থাকলে পশ্চিমবঙ্গের কী অবস্থা হবে কে জানে!
সত্যর কথা শুনে হিরণের মনে হল আজকের পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে ওর নিজের জীবনের কত মিল ! দেশভাগ তো শুধু ওপার বাংলাকে কেড়ে নেয়নি এপার বাংলার থেকে, এপার বাংলাকে দিয়েছে নতুন করে গড়ে ওঠার সুযোগও।
ঠিক যেমন ওই মানুষটা চলে গিয়ে কেবল বিপদের মধ্যেই ফেলেনি হিরণকে। দিয়েছে ওর নিজের জীবনকে নতুন করে সাজিয়ে নেওয়ার সুযোগও। সেই কাজটাই আস্তে আস্তে করার চেষ্টা করছে হিরণ। একটা দুর্গাপুর, একটা কল্যাণী বানাবার চেষ্টা করছে নিজের ছোট্ট জীবনে। ওর হঠাৎ মনে হল, এরপর থেকে নিজের শরীরের যত্ন নিতে হবে ওকে একটু। এতদিন শুধু ছেলে-মেয়ে তিনটের কথাই ভেবে গেছে ও। নিজের কথা একটুও ভাবেনি। কিন্তু বিধানচন্দ্র রায়ের মতো ও যদি হঠাৎই মারা যায় বড্ড বড়ো ক্ষতি হয়ে যাবে ওর তিন ছেলেমেয়ের। ওর নিজের স্বপ্নও পূরণ হবে না। সত্য-গোবিন্দ চাকরি পাক, প্রতিষ্ঠা পাক–এসব তো ওর স্বপ্ন। কিন্তু হঠাৎ যদি ও মরে যায় তাহলে এসব কিছুই ও দেখে যেতে পারবে না। নিজের খাওয়াদাওয়া, নিজের শরীরকে এতদিন চূড়ান্ত অবহেলাই করেছে হিরণ। বিধানচন্দ্র রায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে ও ঠিক করল, এরপর থেকে একটু যত্ন নেবে নিজের।
৩২
গৌতমকে নিয়েই এখন দিন কেটে যাচ্ছে হিরণের। গৌতমের একটা ডাক নাম দিয়েছে ও। সেটাই মোটামুটি গৌতমের নাম হয়ে গেছে। আসলে স্বাস্থ্য চমৎকার হয়েছে ওর নাতির। এক মাথা কোঁকড়া-কোঁকড়া চুল। গোলগাল চেহারা। তাই হিরণ ওকে জন্মের কয়েক মাস পরে দেখে ডেকে ফেলেছিল ঘোঁতনা। সেই থেকে গৌতমের নাম হয়ে গেছে ঘোঁতনা। হিরণের সঙ্গে কেমন যেন এক অন্য সম্পর্ক হয়ে গেছে ঘোঁতনের। হিরণকে দেখলেই ও খিলখিল করে হাসে। মনে হয় হিরণকে ও যেন কত জন্ম ধরে চেনে। অথচ এত কাছ থেকে হিরণকে ও দেখছে তো মাত্র কিছুদিন ধরে। পুজোর ঠিক আগে আগে প্রায় এক মাস হল গীতা আর ঘোঁতন এসেছে রামসাগরে। কিছুদিন পরেই ওর মুখেভাতের ব্যবস্থা করতে হবে। সেটা অবশ্য হবে কোন্নগরেই। তার আগে অবধি ওরা এখানেই থাকবে।
মা হওয়ার পরে গীতার শরীরে একটু মেদ জমা হয়েছে। মুখ হয়ে গেছে গোলগাল। তবে কাজে-কর্মে ও বেশ নিপুণা হয়ে উঠেছে। সংসারের দায়িত্ব ঘাড়ে পড়লে মেয়েরা যে কতখানি পালটে যায়, সে তো হিরণের চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না। সেই পরিবর্তনগুলো নিজের মেয়ের মধ্যে দেখতে পেয়ে ও খুশিই হচ্ছে।
সবচেয়ে বড়ো পরিবর্তন হয়েছে এটাই যে, গীতা আগের চেয়ে অনেক বেশি সঞ্চয়ী হয়ে উঠেছে। আগে যখন ও মাঝেসাঝে রান্না করত, তেল নুন চিনি, মশলাপাতি এসব খরচের কোনো হিসেবে থাকত না। এখন হিরণ দেখল এসব বিষয়ে অত্যন্ত সংযমী হয়ে উঠেছে গীতা। কম পয়সায় ওকে যে টেনেটুনে সংসার চালাতে হয় তা বেশ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
সকালবেলা ওদের উঠোনে অল্প একটু রোদ আসে। সেখানে দু-পায়ের ওপর ঘোঁতনকে শুইয়ে তেল মালিশ করে দিচ্ছে হিরণ। আরামে ঘোঁতনের চোখ বুঁজে আসছে। বছরের এই সময়টা খুব ভালো লাগে হিরণের। শরৎ শেষ হয়ে হেমন্ত আসব আসব করে এ সময়। বাতাসে অল্প হিমের পরশ পাওয়া যায়। সকালের দিকে রোদ্দুরের তেজ ভয়ংকর থাকে না। তাই প্রতিদিনই এ সময় ঘোঁতনকে তেল মালিশ করে দেয় হিরণ। এখন ওর ডে শিফট ডিউটি চলছে। সকালের এই সময়টুকুও ফাঁকাই পায়। বড়ো যত্ন করে ও নাতির সেবা করে এই সময়। ঘোঁতনকে তেল মাখাতে মাখাতে স্নান করাতে করাতে খাবার খাওয়াতে খাওয়াতে আরও একটা জিনিস হিরণ বুঝতে পেরেছে। যতই মনে করুক না কেন নার্সের কাজটা ওর জীবনের অঙ্গ, ও বড্ড ভালোবাসে রুগিদের সেবা করতে, কিন্তু আসলে ওটা ওর চাকরিই। তাই এখন সারাক্ষণ হাসপাতালে থাকলে ওর মনে হয় কখন ওর শিফট শেষ হবে আর বাড়ি ফিরেই দেখতে পাবে ঘোঁতনকে। শিফট শেষের দিকে নতুন কোনো রোগীর নতুন কোনো সমস্যা হঠাৎ চলে এলে এখন ওর বিরক্ত লাগে। মনে হয় বাড়ি ফিরতে দেরি হবে। কিন্তু ঘোঁতনের জন্য কোনো কাজ করতে ওর একেবারেই বিরক্ত লাগে না। এর মধ্যেই বেশ কয়েক রাত ওকে জাগিয়েছে বিচ্ছুটা। ও কিন্তু এক ফোঁটাও ক্লান্ত হয়নি। দিব্যি পরেরদিন ডে শিফট ডিউটি করেছে।
যতদিন যাচ্ছে ঘোঁতনের সঙ্গে গোবিন্দর সম্পর্কটাও খুবই ভালো হচ্ছে। গোবিন্দ মামা বলে ডাক দিলেই ঘোঁতন ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। সে যতদূর থেকেই গোবিন্দ ডাক দিক না কেন। শুনতে পেলেই হল। তারপর গোবিন্দকে যেই দেখতে পায় ঘোঁতন, অমনি ফিক করে হেসে দেয়। মামা-ভাগ্নের মধ্যে যে অন্য এক ধরনের সম্পর্কের কথা শুনে এসেছে হিরণ, যে-সম্পর্কের মধ্যে কেবল শ্রদ্ধা আর সম্ভ্রমই থাকে না, থাকে অবিমিশ্র ভালোবাসা, সেই সম্পর্ক ওর দাদার সঙ্গে সত্য বা গোবিন্দর হয়নি। কিন্তু, সেই রকম এক সম্পর্কই যে গোবিন্দ আর ঘোঁতনের মধ্যে জন্ম নেবে, তার ইঙ্গিত ও ইতিমধ্যেই পেতে শুরু করেছে।
♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦
ক্রমশ..
আগের পর্ব পড়ুন: হিরণবালা । পর্ব ১৭
❤ Support Us








