Advertisement
  • ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
  • আগস্ট ১৭, ২০২৫

হিরণবালা । পর্ব ১৭

মানুষ ভাবে এক আর হয় আর এক । জীবন দিয়ে ক্রমশ হিরণ বুঝতে পারছে কথাটা কত সত্যি । না চাইতেই যেমন মাঝে মাঝে আশাতীত অনেক কিছু পাওয়া যায়, তেমনই প্রায়ই যা চাওয়া হয়, তা পাওয়াও যায় না । দাদা বলেছিল, পড়াশুনোই আমাদের মতো মানুষের সবচেয়ে বড়ো সার্টিফিকেট। কথাটা ভুল বলেনি । কিন্তু এই ভাবনা থেকে ওকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল আর্থিক কষ্টই । অঢেল টাকা মানুষের জীবনে প্রয়োজন না হলেও, স্বাচ্ছন্দ্যে জীবননির্বাহ করার মতো টাকাটুকু মানুষের দরকার, তারপর...

অংশুমান কর
হিরণবালা । পর্ব ১৭

 
২৯

 
হিরণ দিদা হতে চলেছে। এ এক অদ্ভুত অনুভূতি। এই ক-বছরে কত কত শিশুর জন্ম হয়েছে ওর হাতে। কত কত শিশুর প্রথম কান্না শুনেছে হিরণ। কিন্তু এটা ভাবতেই ওর কেমন একটা শিহরন লাগছে যে, গীতার শরীরেও জন্ম নিয়েছে ছোট্ট প্রাণ, আর কিছুদিন পরেই সে পৃথিবীর আলো দেখবে। কোথাও একটা সেই মানুষটার রক্ত বহন করবে শরীরে। হিরণের দেশের মাটি এ দেশেও পরের প্রজন্মের রক্তে এভাবেই বেঁচে থাকবে। মাটি মরে না। মানুষ যেখানে যায় মাটি তার সঙ্গে সঙ্গে যায়। মাটিরও প্রাণ আছে।
 
গীতা গর্ভবতী হওয়ার পর থেকেই ওদের সংসারের আর্থিক দুরবস্থা আরও ভালো করে বুঝতে পেরেছে হিরণ। এসময় একটু ভালো-মন্দ খাওয়া দাওয়া করতে হয়। শরীরের পর্যাপ্ত বিশ্রামের দরকার হয়। গীতার চিঠি থেকে হিরণ বুঝতে পারছিল যে, সে সবকিছুই গীতা পাচ্ছিল না। তাই হিরণ নিজেই গীতার নামে মানি অর্ডার করতে শুরু করে। সেই টাকাতেই গীতা ফলমূল কিনে খেয়েছে। কিন্তু ঘরের কাজ ওকে করতে হয়েছে এই কিছুদিন পর্যন্ত। আসলে মনোরঞ্জন মাইনে পায় খুব সামান্যই। সত্যিই টেনেটুনেই ওদের সংসার চলে। আগামীকাল হিরণ কোন্নগর যাবে। কলকাতা মেডিকেল কলেজে পরশু গীতাকে ভরতি করবেন ডাক্তারবাবু। এমনটাই কথা হয়ে আছে।
 
কোন্নগরে গীতাদের বাড়িতে গিয়ে গীতাকে দেখে অবাক হয়ে গেল হিরণ। তার সেই ছোট্ট মেয়েটার শরীর যে এমন ভরভরন্ত হয়ে উঠবে এই ক-দিনে, হিরণ ভাবতেই পারেনি। বেশ মোটাসোটা গোলগাল হয়ে গেছে গীতা। উদর স্ফীত। সেই স্ফীত উদরের মধ্যেই রয়েছে হিরণ আর সেই মানুষটার রক্তের খানিকটা। নিজের মেয়েকে এই অবস্থায় দেখে কী যে অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে হিরণের, তা সে বলে বোঝাতে পারবে না।
 

আজ গীতার কোল আলো করে ছেলে এল। এ তো একদিক থেকে হিরণের বংশ রক্ষাই হচ্ছে। শুধু যে ওর আর সেই মানুষটার রক্তই রয়ে গেল গীতার ছেলের শরীরে, তা তো নয়। হিরণের বাবা মায়ের রক্তও তো থাকল। ওর পূর্বপুরুষদের রক্ত ও তো থাকল

 
গীতার জন্যই কলকাতা মেডিকেল কলেজে পা রাখা হল হিরণের। কী বিশাল এই মেডিকেল কলেজ ! কত রুগি, কত মানুষ, সারাদিন হাসপাতাল চত্বর গমগম করছে। কলকাতা মেডিকেল কলেজে ঢুকে হিরণের মনে হল তার কাজের জায়গাটা কত ছোট্ট। কত তফাৎ রাজ্যের একটা প্রধান মেডিকেল কলেজ আর তাদের ছোটো ছোটো হেলথ সেন্টার গুলোয়। চাইলেও মানুষের অনেক চিকিৎসা, সেবা ওরা করে উঠতেই পারে না। এখানে কিন্তু সবই সম্ভব।
 
গীতাকে যখন ওটির ভেতরে নিয়ে গেল তখন হঠাৎ করে বুকের ভেতর ঢিপটিপ করতে শুরু করল হিরণের। চিকিৎসা ব্যবস্থা এখন অনেক এগিয়ে গিয়েছে। প্রসূতি মৃত্যুর হার কমছে সারাদেশেই। কিন্তু তবুও হিরণের কেমন যেন ভয় লাগতে শুরু করল। মনে হল যদি কিছু হয়ে যায় গীতার, মনে হল যদি দেখা যায় গীতার সন্তানের কোনো একটা অঙ্গ নেই, তখন ও কী করবে ! ওর পাশে মনোরঞ্জন দাঁড়িয়ে আছে। ওর মুখ শান্ত। ওকে দেখে বোঝাই যাচ্ছে না আদৌ ওর কোন টেনশন হচ্ছে কি না। ওর মুখ দেখে ওর ভয় লাগছে নাকি আনন্দ হচ্ছে তাও বোঝার কোনো উপায় নেই। মনোরঞ্জন এরকমই। চুপচাপ থাকে। কথা প্রায় বলে না বললেই চলে।
 
গীতাকে ভেতরে নেওয়ার প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট পরে ওটির বাইরে বেরিয়ে এসে সিস্টার ওদের জানালেন ছেলে হয়েছে। সিজারিয়ান ডেলিভারি। হিরণের চোখের কোণে জল চলে এল। মনে হচ্ছে এই তো সেদিন ধাই মা গীতাকে ওর কোলে তুলে দিয়েছিল নড়িয়াতে। আর আজ গীতার কোল আলো করে ছেলে এল। এ তো একদিক থেকে হিরণের বংশ রক্ষাই হচ্ছে। শুধু যে ওর আর সেই মানুষটার রক্তই রয়ে গেল গীতার ছেলের শরীরে, তা তো নয়। হিরণের বাবা মায়ের রক্তও তো থাকল। ওর পূর্বপুরুষদের রক্ত ও তো থাকল।
 
গীতাকে যখন বেডে দিল তখনও ওর আচ্ছন্ন ভাবটা পুরোটা কাটেনি। তবু তারই মধ্যে মেয়েটা হাসছে। হিরণ গিয়ে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। মনোরঞ্জন তখনও চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে গীতার পাশে। একটি কথাও বলছে না। একটু পরেই সিস্টার একেবারে পুতুলের মতো একটা ছোট্ট ছেলেকে এনে দিল হিরণের কোলে। কী মিষ্টি হয়েছে গীতার ছেলে। মাথা ভরতি কোঁকড়া কোঁকড়া চুল। ওয়েট হয়েছে তিন কেজি। পিট পিট করে চোখ খুলে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। গীতা ঘাড় উঁচু করে দেখল ওর ছেলেকে। ওটিতে নিশ্চয়ই ওকে ছেলেকে দেখিয়েছিল একবার। তাই নিয়ম। কিন্তু, তখন তো গীতা আরও আচ্ছন্ন ছিল। ভালো করে দেখতে পায়নি হয়তো। এবার তাই ভালো করে দেখল নিজের সন্তানকে। তারপর অস্ফুটে বলল, মা বাবার মতো হইসে না খানিকটা ?
 
ছ্যাঁৎ করে উঠল হিরণের বুক। সেই মানুষটাই কি ফিরে এল তবে গীতার ছেলে হয়ে ? তাররপরেই ওর মনে হল তা কী করে হয় ? মানুষটা তো নিশ্চয়ই জীবিত এখনও। জীবিত মানুষ তো অন্যরূপ ধারণ করতে পারে না। এই প্রথম হিরণের মনে হল, মানুষটা যদি মরে যেত তাহলে হয়তো মন্দ হতো না। মরে গেলে ও হয়তো বিশ্বাস করতে পারত গীতার ছেলে হয়েই ফিরে এসেছে মানুষটা। যে পুতুলটাকে এখন ও কোলের মধ্যে নিয়ে আছে, তাকে আঁকড়ে ধরেই বাকি জীবনটুকু কাটিয়ে দিতে পারত। এরকম ভাবনা আসার পরেপরেই ওর হঠাৎ যেন চৈতন্যোদয় হল। মনে হল, ছি ছি, এসব কী ভাবছে ও ! যেখানেই থাক, মানুষটা বেঁচে থাকুক, সুস্থ থাকুক।

 
৩০

 
সংসার এক বিচিত্র জায়গা। খুব কাছের মানুষের সঙ্গেও কীভাবে যে সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায় তা আগে থেকে বোঝা যায় না। এদেশে আসার পর থেকে যে-দাদা ছিল ওর সবচেয়ে কাছের মানুষ, সেই দাদার সঙ্গেই সম্পর্ক বেশ জটিল হতে শুরু করেছে। এর কারণ টাকা। রামকৃষ্ণদেব যতই বলে যান ‘টাকা মাটি মাটি টাকা,’ টাকা ছাড়া মানুষের জীবন অচল। টাকাই মানুষের জীবনে এক বড়ো অশান্তির কারণ। তা না হলে দাদার সঙ্গে ওর সম্পর্ক হঠাৎ এমন তিক্ত হয়ে যায় না।
 
গীতার বিয়ে দেওয়ার সময় বেশ অনেকটা টাকাই হিরণকে ধার করতে হয়েছিল দাদার কাছ থেকে। দাদাকে ও বলেছিল, এক বছরের মধ্যে সে টাকা ও শোধ করে দেবে। কিন্তু পারেনি। তার একটা বড়ো কারণ, গত এক বছর ধরে প্রতি মাসে গীতাকে বেশ খানিকটা টাকা হিরণ মানি অর্ডার করে এসেছে। তাই এক বছরে যতখানি টাকা ও জমাবে ভেবেছিল, তার ধারেকাছেও ওর জমানো টাকা পৌঁছয়নি। কিছুদিন আগেই ও সেই জমানো টাকাটুকুই দাদাকে মানি অর্ডার করে লেখে যে, বাকি টাকাটুকু এক বছর পরে ও দেবে। এরপরেই দাদার কাছ থেকে একটা চিঠি এসেছে, যে-চিঠিটা হিরণ একেবারেই প্রত্যাশা করেনি। দাদা সেই চিঠিতে লিখেছে,

 
কল্যাণীয়া হিরণ,
 
টাকাটুকু পাইলাম। যাহা দিয়াছিলাম, ইহা তাহার তুলনায় কিছুই নহে। আমি ভাবিয়াছিলাম, তুমি তোমার কথা রাখিবে। ভাবি নাই যে, তুমি কথার খেলাপ করিবে।
আসলে সংসার আমাকেও কষ্ট করিয়াই চালাইতে হয়। সত্যর এযাবৎকাল ভরণপোষণের দায়িত্ব কষ্ট সত্ত্বেও আমি বহন করিয়াছি। সত্যর পড়াশোনা ও রাহা খরচ বাবদ একটি পয়সাও তোমার থাকিয়া লই নাই।
আমার মনে হইতেছে গীতার বিবাহ এত সত্বর না দিলেও চলিত। তোমার অর্থ জমিলে তবেই গীতার বিবাহ দেওয়া সঠিক হইত।
হয়তো কটুকথা লিখিয়া ফেলিলাম। কিছু মনে করিও না।
আশীর্বাদ লইও।
 
ইতি
দাদা

 
চিঠিটি পেয়ে স্তম্ভিত হয়ে গেছে হিরণ। ও ভাবতেও পারেনি কোনোদিন দাদা ওকে এই রকম একটি চিঠি লিখতে পারে ! এ কথা ঠিক, সত্যর পড়াশুনো ও থাকা-খাওয়ার খরচ বাবদ প্রায় কোনো টাকাই হিরণ দাদাকে দিতে পারেনি। কিন্তু ওর মনে কোনোদিন এই ভাবনাটাও আসেনি যে, এ বিষয়টা নিয়ে কণামাত্র খোঁটা দাদা ওকে দিতে পারে। কিন্তু তাই হল। বিয়ের সময় হিরণের এটাও মনে হচ্ছিল যে, মনোরঞ্জনকে পাত্র হিসেবে শেষ পর্যন্ত যে কোনো কারণেই হোক দাদার খুব একটা পছন্দ হয়নি। বিয়ের গোটা প্রক্রিয়াটাতে হিরণ যতখানি সুরেন গোঁসাই আর গোবিন্দর বন্ধুদের ওপর নির্ভর করেছিল, ততখানি দাদার ওপর নির্ভর করেনি। আসলে ওদের ওপরে নির্ভর না করে হিরণের উপায়ও ছিল না। কারণ দাদা এসেছিল বিয়ের মাত্র ক-দিন আগে। বাকি কাজ করার জন্য ওকে তো সুরেন গোঁসাইয়ের ওপর অনেকখানি ভরসা করতে হয়েছিল। হতেই পারে যে, এই সব মিলিয়েই ভেতরে ভেতরে কোথাও একটা দাদার ক্ষোভ জমা হয়েইছিল। ধার-দেওয়া টাকার প্রসঙ্গে তা বেরিয়ে এসেছে।
 

বুদ্ধও তো বোধিলাভের জন্য সংসার পেছনে ফেলে চলে গিয়েছিলেন। কোথাও একটা নাতির নাম গৌতম রেখে হিরণের মনে হয়েছে বুঝি বা এই নামের মধ্যে দিয়েই ওই মানুষটাকে একটুখানি ছুঁয়ে রয়েছে হিরণ। ভেবেচিন্তেই হিরণ নাতির নাম রেখেছে গৌতম। টাকার মতোই নামেও অনেক কিছু যায় আসে বৈকি !

 
টাকা শোধ করা আর গীতার বিয়ে নিয়ে দাদা যা লিখেছে, তা যদি বা হিরণ সহ্য করতে পারছে কিন্তু সত্যর পড়াশোনা আর থাকা-খাওয়ার খরচ নিয়ে যে-খোঁটাটা দাদা দিয়েছে, তা কিছুতেই হিরণের হজম হচ্ছে না। ও মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে, টাকা যেভাবেই হোক ও দাদাকে ফেরত দেবে। গীতার বিয়ের জন্য যে-টাকা ও দাদার কাছ থেকে নিয়েছিল, সেই টাকা শোধ করতে গেলে এক্ষুনি ওকে আর একবার ধার নিতে হয়। সেটাও উচিত কাজ হবে কি না ও বুঝে উঠতে পারছে না। তার ওপর সম্ভবত আরেকটা চাপ হিরণের ঘাড়ে চাপতে চলেছে। গীতার ছেলেকে বড়ো করার জন্যও আগের মতোই প্রতি মাসে কিছু টাকা সম্ভবত ওকে গীতাকে পাঠাতে হবে। গীতা সরাসরি মুখে কিছু বলেনি। কিন্তু, হাবেভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে। হিরণও ভেবেছে যে, আগের মতোই গীতাকে টাকাটুকু ও দেবে। পুতুলের মতো নাতিসোনার কোনো কষ্ট ও সহ্য করবে না। নাতির নামও রেখেছে হিরণই। গৌতম। গৌতম তো বুদ্ধর নাম। বুদ্ধও তো বোধিলাভের জন্য সংসার পেছনে ফেলে চলে গিয়েছিলেন। কোথাও একটা নাতির নাম গৌতম রেখে হিরণের মনে হয়েছে বুঝি বা এই নামের মধ্যে দিয়েই ওই মানুষটাকে একটুখানি ছুঁয়ে রয়েছে হিরণ। ভেবেচিন্তেই হিরণ নাতির নাম রেখেছে গৌতম। টাকার মতোই নামেও অনেক কিছু যায় আসে বৈকি ! সবচেয়ে স্বস্তির এটাই যে, এই নামটা মনোরঞ্জনদের বেশ পছন্দ হয়েছে।
 

♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦

ক্রমশ..
 
আগের পর্ব পড়ুন: হিরণবালা । পর্ব ১৬

হিরণবালা । পর্ব ১৬


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!