Advertisement
  • ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
  • আগস্ট ৪, ২০২৪

মাটি ব্রতের আখ্যান।পর্ব ৩৭

সুধীরকুমার শর্মা
মাটি ব্রতের আখ্যান।পর্ব ৩৭

।। ফলকান্ড ।। 

স্নেহময়ী রাজমাতার ঘাট

বড়োবাজার।
 
কাটরা থেকে থানের অতিকায় গাট্টুগুলি ঘাড়ে বয়ে আনতে সাধনের এখন কষ্টই হয়, হাফ ধরে, বয়স যে সর্পিলগতিতে ক্রমেই উপরের দিকে রওনা দিয়েছে, আজ ভালোরকম টের পেল। কাটরার নিচ থেকেই ঠেলা মেলে, যে কেউ ডেকে নেয়। সাধন ব্যতিক্রম। রাস্তায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষার ঠেলাওয়ালারা যেন একেকটি লাটবেলাট। খইনি ঠাসা মুখ, পিরিচ করে পিক ছড়িয়ে কুড়িটাকা হেঁকে বসে। গলিটা থেকে হালে মহাত্মা গান্ধির নামে নয়া পরিচয়ে হ্যারিসন রোড কতটুকু দূর ! মালের বহর না থাকলে একজনের সাত আট মিনিট সময় লাগে। ভিড় ঠেলে আসতে হয় তো। ঠেলাওয়ালারা সে রোডে নামিয়ে দেয় বস্তাবাস্তা। ওখান থেকে ধরতে হবে মানুষটানা রিক্সা। দরাদরি করলে ছিরকুটে দাঁতে কালো ঝিলিক তুলে বলবে — বঙ্গালিবাবু, আপ চাহে তো একঠো টেম্পু ভাড়া লিজিয়ে — কথায় শুধু ব্যঙ্গ নয়, অসম্মান খোদাই করা, সাধন টের পায়। একবার দুবার ট্রান্সপোর্টের সঙ্গে ব্যবস্থা করেছিল। মাল ঠিকই পৌঁছায়, তবে কখন সে লরি আসবে, তার সময় নির্দিষ্ট থাকে না। ওতে মাল তুলে দিলে আরামটা অবশ্যই বেশি থাকে। তখন খালি হাতে হেলেদুলে সোজা শিয়ালদা স্টেশনে আসা যায়। পকেটে রেজগি থাকলে, মনে ইচ্ছা ছটফটালে, স্টেশনমুখো ট্রামে উঠে পড়ো, এমন আরামের গাড়ি কোথাও নেই। ট্রান্সপোর্টে খরচটাও বেশি পড়ে যায়। তার একগাড়ি মাল নয় যে ‘ডেসকাউন’ পাবে। রমা বড়ো গজগজ করে। ছেলেটা তাড়াতাড়ি বড়ো হলে সুলুক হতো।
 
 রমা এদিকে ভয় পাচ্ছে, সাধনের কাছে খোলসা করে — কী জানি ! কী মনে লয় জানো ! গুপাল যুদি বাপের কারবার না ধরে ! সকলের দেখি চাকুরির রুগ ধরতাছে। ওই যে, তোমাগো বাজারের সরকার মশয়ের কতবড়ো দুকান। ইসটেশনারি। তার দুই লায়েক পুলা। নুকরি খুইজ্যা মরতাছে। দিল্লি আগ্রেতেও নাকি যাইতে পারে। ইদিকে দেখছো ! সরকারদাদার দুকানখান যায় যায়। সেদিন আমারে সরকারদিদি কইলো। দুকানের অদ্ধেকখান নাকি বেচবো। আমাগো পুলায় যদি ওই পথ ধরে! কইতে তো পারি না। কালের নিয়ুম। 
 
 শুনে সাধনেরও ভয় বেড়ে যায়। ব্যবসাটা আয়তনে ও প্রকৃতিতে বেড়েছে। বেচাকেনার জন্য একটা অল্পবয়সী কর্মচারী দোকানে রাখতেই পারে। 
 
 রমা রাজি হচ্ছে না — কয়দিন দাঁতে দাঁত বাইন্ধা তুমি আমি থাকি। পুলা সাবাল হউক। তারপর বাপের ব্যবসাখান না ধরলে দেখা যাইবো। আরে বাবা ! অহনও তো পঞ্চাশে পড়ো নাই। অত বুড়া বুড়া ভাব দেখাও ক্যান ? কওতো। বুড়া বরের বউ হইতে ভাল্লাগে নাকি আমার ! — একগাল হাসির আলো ছড়িয়ে হারিয়ে যাওয়া দিনের রমা যেন সুদূর ধরিত্রীর সীমান্ত থেকে উড়ে ফিরে এসেছে তখন। 
 
 বউয়ের আদেশ মানতেই হয় সাধনকে, উপায়ান্তর নেই। রমা ব্যবসাটা বোঝে ভালো। সাধন ফিরে যাচ্ছে সেই রাতে, নিতাই সরকারের বাড়িতে মিটিং, ফেরার পথ, আধাচেনা যুবতী রমা সাধনের হাত ধরে ব্লাউজ বিক্রির ব্যবসাটা তুলে দিয়েছিল। সেই ব্যবসা আজও বয়ে চলেছে। 
 
হকার্স কর্ণারে সাধনের দোকানে বিক্রির ধূম লেগে যায় প্রতিদিন সন্ধের পর।মেয়েবউদের এত ভিড় যে ছোটো কাউন্টারের সামনে রাখা চারখানা কাঠের টুলে কুলোয় না। খদ্দেরেরা দাঁড়িয়ে থাকে অপেক্ষায়। মেয়েরা একটা ব্লাউজ পছন্দ করতে এই দেড়ঘন্টা সময় লাগিয়ে দেয়, খুঁতখুঁতুনির যেন অন্ত নেই।  সাধনের দোকানের ব্লাউজ একটি নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের— এইচ টি ডব্লিউ। হেম টেলারিং নামটা রমার পছন্দ ছিল। একদিন অনিমেষ এসে বললো — বউদি, ওয়ার্কস কথাটা জুড়ে দাও, তোমার যে সেলাইয়ের কারখানা। একেবারে শিল্পপতি হয়ে গেলে। টাটা বিড়লার পরেই আমাদের রমা বউদি — হাসছিল অনিমেষ। হকার্সে আরও দুটি দোকানে এই ব্র্যান্ডের কাউন্টার আছে। সাধন সপ্তাহে দুদিন সকালের দিকে দোকান বন্ধ রাখে। সেদিন অর্ডার পাওয়া তৈরি মাল পৌঁছে দিতে যায় অর্ডারদাতাদের কারখানায়। ওই ব্লাউজগুলিতে এইচ টি ডব্লিউ ফেরতাটি থাকে না, বদলে অন্য ব্র্যান্ডের চিহ্ন। অর্ডার যারা দেয়, তারা ফেরতার ফিতেটি পাঠিয়ে দেয়। 
 

উলটো ফুট দিয়ে টানা রিক্সাগুলো হাওড়ার দিকে ছুটছে, এ ফুটে একটারও দেখা নেই। একেকদিন এরকম হয়। সাধন হাঁসফাঁস করছিল। আর একটু পরেই অফিসবাবুদের ঘরে ফেরার নিত্যপরবটি শুরু হয়ে যাবে। সেসময় মালপত্র নিয়ে স্টেশনে ঢোকা ঝক্কির ব্যাপার, ঠোকা লাগে তাদের গায়ে মাথায়, বিরক্তি চাপতে পারে না। ভেন্ডারে মাল তুলবে সেখানেও ডেলি প্যাসেঞ্জার ভিড় করে থাকে

 
রমা খুব ভালো, খুব গোছালো। আজকে স্বীকার করে সাধন যে তার মন একটু একটু নাড়া দিচ্ছিল, সাহস পায়নি। যে ডাকাত মেয়ে! খুড়িমা তার সাধনকে তুলে দিয়েছিলেন রমার হাতে। ছেলের অভিভাবক চিনতে হেমশশীর ভুল হয়নি।
 
সাধনের কাঁধে তিন তিনখানা হাতিমাপের গাট্টু। মহাত্মা গান্ধি রোড ছুঁয়ে সে থামলো। বাঁদিকে, মুখেই, তৈরি চা বিক্রির দোকান। রমরমা ব্যবসা। দোকানদার অবাঙালি। দোকানঘেঁষে ফুটপাতে বেঞ্চিপাতা। সাধন বেঞ্চির ধারে দেয়ালের গায়ে গাঁটরিগুলোকে থাক থাক সাজায়। বেশিক্ষণ রাখা যাবে না। ওর মতো বড়োবাজারে আসা খদ্দেরেরা মাল রাখলে ফুটপাথ জুড়ে যাবে। পথচারীরা জানে, এখানে এরকম হয়, তাই ফুটপাথ ছেড়ে রাস্তার ধার দিয়ে হাঁটে। কেউ কেউ অশ্রাব্য খিস্তি ছুঁড়ে দেয়। সাধনও শুনেছে বিস্তর। জেনে গেছে এরকম হলে বধির থাকাই জ্ঞানী মানুষের কর্তব্য।
 
সাধন বসলো বেঞ্চিতে, হাঁফ টানলো সময় নিয়ে, জল চেয়ে খেল, তারপর বললো — সাউজি, একটা ডবুল চা, দুটো লম্বু লাগাও। 
 
সাউজি তাকে চিনে গেছে, বাঁধা খদ্দের, কাটরা থেকে বেরিয়ে সাধন এখানেই বিশ্রাম নেয়, যতক্ষণ খুশি বসে থাকে, বললো — বঙ্গালীর বেওসা হোয় না, বাবুজি। লেকিন আপনার হোয়। মারবাড়িদের দেখেন। বাপকে কেত পইসা। অওলাদকে দেখেন। রাস্তে মে ঘুমছে। গলে মে দড়ি ঝুলছে। দড়ি মে ডালা। অউর ওহি মে সিগরেট বিড়ি এগারা বেগারা। অসলি বাত, ও লেড়কা আপরেন্টিস লিচ্ছে। নাফা মিলবে। লুকসান ভি। লেকিন ওহো শিখ নিবে বেওসা কী চিজ। তারপোর একদিন দেখলেন কোয়ি কাটরেমে ও হো সিগরেটি ইজেন্সি খুল দিলো। ই রাস্তে পে দুসরা কাটরা আছে, যান, দেখেন সিজর্স সিগরেটকি গোডাউন। ও হো শেঠ ছয় মাস পহেলে ফেরিবালা থা।
 
উলটো ফুট দিয়ে টানা রিক্সাগুলো হাওড়ার দিকে ছুটছে, এ ফুটে একটারও দেখা নেই। একেকদিন এরকম হয়। সাধন হাঁসফাঁস করছিল। আর একটু পরেই অফিসবাবুদের ঘরে ফেরার নিত্যপরবটি শুরু হয়ে যাবে। সেসময় মালপত্র নিয়ে স্টেশনে ঢোকা ঝক্কির ব্যাপার, ঠোকা লাগে তাদের গায়ে মাথায়, বিরক্তি চাপতে পারে না। ভেন্ডারে মাল তুলবে সেখানেও ডেলি প্যাসেঞ্জার ভিড় করে থাকে। মাঝে মাঝে সাধনেরও রাগ হয়, তপ্প সংলাপের আদান প্রদান ঘটে যায়। মাথা ঠান্ডা হলে লোকগুলোর দোষ খুঁজে পায় না সাধন। আঁধার হলে ঘুম নেতা শিশুটার মুখটাকে দেখে ওরা রওনা দিয়েছে, ফিরতে ফিরতে রাত নটা সাড়ে নটা, বাচ্চটা বাবার জন্য জেগে জেগে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে তখন। সাধন ভাগ্যবান, রোজ তাকে কলকাতা আসতে হয় না। 
 

♦—♦♦—♦♦—♦♦—♦

ক্রমশ…
 
আগের পর্ব পড়ুন: পর্ব ৩৬

মাটি ব্রতের আখ্যান। পর্ব ৩৬


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!