- ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
- এপ্রিল ২৭, ২০২৫
হিরণবালা । পর্ব ২
স্বামী নিরুদ্দেশ, দায়িত্ব নিতে নারাজ শ্বশুর বাড়ি । তিন সন্তানকে নিয়ে, অবিভক্ত বাংলার গোয়ালন্দ স্টিমারঘাটের পাশের গ্রামের অসহায় গ্রাম্য বধুটির সামনে শুধুই অনিশ্চয়তা । নার্সের চাকরি পাবার কোনো যোগ্যতাই তো ওর নেই । তবু দরখাস্ত লিখল । তবে তা দরখাস্ত নয়, পুরো জীবনবৃত্তান্তই...
৩
হিরণবালার বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে এসেছিল এক ঘটক। কানুরঞ্জন দাস। চিমসে মতো চেহারা। শেয়ালের মতো খ্যাকখ্যাক করে হাসত। লোকটাকে একেবারে পছন্দ হত না হিরণের। কিন্তু বাবার ছিল কানুরঞ্জন দাসের ওপর অগাধ ভরসা। দিদি বিজলীবালার যে ভালো বিয়ে হয়েছিল, সে তো এই ঘটকের কল্যাণেই। আজ যে ঢাকা শহরে দিদি থাকে বলে ওর বেশ খানিকটা গর্ব হয়, সে তো ওই কানুরঞ্জন দাসের জন্যই। দিদি অবশ্য ওর খোঁজখবর তেমন একটা নেয় না। তার বর ডাক্তার। দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে সুখের সংসার। বাবা-মা বা বোনেদের খবর নেওয়ার তেমন সময় দিদির হয় না। কানুরঞ্জন দাসের ঘটকালিতে ছোটো বোন লাবণ্যবালার বিয়েটা অবশ্য তেমন ভালো হয়নি। তিন বোনের মধ্যে লাবণ্যই দেখতে সবচেয়ে সুন্দরী। অথচ লাবণ্যর বর হল মাতাল। দোকান আছে একটা। দোকানে বসে না। ওদের জমি-জমা-সম্পত্তির যে-বিবরণ কানুরঞ্জন দাস দিয়েছিল, সেসবও ভুয়ো। হিরণের মানুষটা অবশ্য লাবণ্যর বরের মতো ছিল না। কানুরঞ্জন সম্বন্ধটা আনার পর হিরণ যখন জেনেছিল যে, ওর বর হবে দোজবরে, তখন অবশ্য ও খুবই ভেঙে পড়েছিল। কতই বা বয়স হবে ওর তখন ! সবে পনেরোতে পা দিয়েছে। তখন সকালবেলা ফুল তুলতে গিয়ে তিনটে বাড়ি পরে থাকা নবীনকিশোরের সঙ্গে রোজ সকালবেলা দেখা হত হিরণের। নবীনকে বেশ ভালো লাগত ওর। একই গাছের ডাল থেকে করবী ফুল তুলতে গিয়ে একদিন নবীনের আঙুলে আঙুল লেগে গিয়েছিল হিরণের। শিউরে উঠেছিল ও। বুঝেছিল শরীরের আলাদা একটা ভাষা আছে। বুঝেছিল মা কেন বলত, মাইয়া মানষের শরীর তার সবচেয়ে বড়ো শত্তুর ! পুরুষ মানুষ যে মেয়ে মানুষের শরীরের দিকে লোভী চোখে চেয়ে থাকে–সেজন্য নয়। শরীর মেয়েমানুষের শত্রু কারণ মেয়েমানুষকে তার নিজের শরীরই অন্য কথা বলে, ভুল পথে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। ওই একটু আঙুলের ছোঁয়াতেই সেদিন একথা বুঝে গিয়েছিল হিরণ। দোজবরে একটা লোকের সঙ্গে তার বিয়ে হতে পারে জেনে তাই প্রথমেই ওর নবীনকিশোরের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল।
শ্বশুরমশাই যেদিন কানুরঞ্জন দাসের সঙ্গে ওকে দেখতে এসেছিলেন, সেদিন হিরণ অনেক কান্নাকাটি করেছিল। মাকে বারবার বলেছিল, দোজবরে কোনো লোককে ও বিয়ে করবে না। মা ওর কথা শোনেনি। বলেছিল যে, এমন ঘর চট করে পাওয়া যায় না। পাত্রদের প্রচুর টাকাপয়সা, জমিজমা, তিনখানা দোকান। ছেলেটার বিয়ের মাত্র এক বছরের মাথায় মেয়ের জন্ম দিতে গিয়ে বউ মারা গেছে। এ বিয়ে আবার বিয়ে নাকি ? আগেকারকালে তো এক একজন পুরুষমানুষ কুড়ি-তিরিশটা করে বিয়ে করত। মেয়েমানুষদের ঘর করতে হত সতীন নিয়ে। এও বলেছিল যে, পাত্র গ্রাজুয়েট। পড়াশোনা করা শিক্ষিত ছেলে। ভালো গান গায়। কেবল কোনকালে একটা বিয়ে হয়েছে বলে এমন পাত্র কেউ হাতছাড়া করে ? সাজিয়েগুছিয়ে মা তাই ওকে হাজির করেছিল প্রাণেশচন্দ্র করের সামনে। শ্বশুরমশাই মানুষটিকে কিন্তু খুব পছন্দ হয়েছিল হিরণের। সুভদ্র চেহারা। নিপাট ধুতি-পাঞ্জাবি, পাম্প শু পরে এসেছিলেন হিরণকে দেখতে। পাত্র নিজে বিয়েতে আগ্রহী নয় উনি জোর করে তার বিয়ে দিচ্ছেন–বারবার বলছিলেন এটা। বলছিলেন যে, ছেলের নাকি মন উড়ু উড়ু। বেশি পড়াশোনা করলে এইই হয়। ঘরে মন বসে না। তিন তিনটে দোকান, এত বড়ো ব্যবসা– সেসব দিকে কোনো নজরই নেই ছেলের। নিজের কচি মেয়েটার পর্যন্ত খোঁজখবর রাখে না। আরেকটা বিয়ে না দিলে এই ছেলেকে ঘরে বেঁধে রাখা যাবে না। ছেলে গান গায় শুনে মন খানিকটা নরম হয়েছিল হিরণের। গান তো ওর খুবই ভালো লাগে। সকালবেলা ফুল তুলতে তুলতে নবীনকিশোরও তো গুনগুন করে গান গাইত। কীর্তন। সেই গানও তো বড্ড ভালো লাগত হিরণের। বেশ ধুমধাম করেই হিরণের বিয়ে হয়েছিল। তবে ভোজ খেতে নবীনকিশোর আসেনি। ওর মা হিরণের মাকে বলেছিল, ওর নাকি জ্বর।
হিরণের মনে হয়, মানুষের সবচেয়ে বড়ো অস্ত্র হল জিভ। কথা দিয়েই কেবল একজন মানুষকে মেরে ফেলা সম্ভব। এইসব এমনিতে বেঁচে আছে কিন্তু আসলে মরে গেছে মানুষজনকে দেখে সব সময় বোঝাও যায় না যে, তারা মরে গেছে। হৃৎপিণ্ড ধুকপুক করে চলে এদের। কিন্তু মন মরে যায়। হৃৎপিণ্ড একটা যন্ত্র, কিন্তু মন তো আর যন্ত্র নয়। লালন সাঁইয়ের গান আছে না ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি ক্যামনে আসে যায়’? মন হল সেই পাখি। তার দানাপানি চাই। খাবারদাবার চাই। মনের খাবার দাবার হল আদরযত্ন। মায়ামাখা কথা। খোঁটা হল বিষ। এই বিষ মনপাখিকে মেরে ফেলে
বিয়ের পর নড়িয়াতে এসে মানিয়ে নিতে বেশ অসুবিধেই হয়েছিল হিরণের। নড়িয়া গঞ্জ মতো জায়গা। কিন্তু গঞ্জ দিয়ে হিরণ করবে কী ? মেয়েমানুষ তো আর ঘরের বাইরে যায় না। ওদের গোয়ালন্দের বাড়ির মতো এদের বাড়িতে বড়ো উঠোন নেই । নারকোল গাছ নেই। নিম গাছ নেই। নিম গাছের পাকা হলুদ ফল নেই । জানলা দিয়ে পদ্মাও দেখা যায় না। মনখারাপের মধ্যে কেবল রাত্তির গুলোই যেন মায়ের মুখে গল্পের শোনা জিনের মতো বশ করে ফেলত ওকে। মানুষটা সারাটাদিন থাকত আউলবাউলের মতো। বড্ড নরম ছিল তার মন। হিরণ অল্প ক-দিনেই বুঝতে পেরেছিল। কিন্তু রাত্রিবেলা লোকটার অন্য রূপ। আদর করত দস্যুর মতো। মনে হত ডাকাতের মতো মানুষটা যেন লুট করে নেবে ওকে।
একদিকে ওকে রাতের পর রাত লুট করে নিতে থাকল লোকটা আর অন্যদিকে ওর কোল ভরে দিতে লাগল সম্পদে। একে একে এল গীতা, সত্য, গোবিন্দ। গোবিন্দর জন্ম অবশ্য শ্বশুরমশাই দেখে যেতে পারেননি। তবে হিরণকে বাড়িতে এনে বড়ো খুশি ছিলেন তিনি। মনে করেছিলেন যে, বড়ো ছেলেটাকে সংসারে বাঁধতে পেরেছেন অবশেষে। হিরণ জানত শ্বশুরমশাই ভুল ভাবছেন। তিনটে দোকানের মধ্যে মিষ্টির দোকানটা দেখার দায়িত্ব ছিল মানুষটার। দোকানে লোকটা যেত, কিন্তু কিছুই দেখত না। সবকিছু সামলাত হারাধন। সে চুরিও করত। এসব নিয়ে দেওররা লোকটাকে বলতে গেলে, সে বলত, মানষেরে সন্দেহ করা আমার কাম না। আমারে দিয়া কাম না হইলে তোরা দোকানে ব। শ্বশুরমশাই এইসব দেখতেন ঠিকই কিন্তু তাও মনে করতেন যে, ছেলেটাকে সংসারে বেঁধে ফেলা গেছে। কারণ হিরণকে বিয়ের পর আর একটিবারের জন্যও ঘর ছেড়ে হঠাৎ করে নিখোঁজ হয়ে যায়নি প্রভাতচন্দ্র কর। এইবার গেল। গেল তো গেলই। হিরণ বুঝতে পারছে যে, মানুষটা আর ফিরে আসবে না।
দেওররা যে লোকটার ওপর রেগে যেত, সেজন্য ওদেরকে পুরো দোষ দিতে পারে না হিরণ। ওদের মনে হত, ব্যবসায়, সংসারে ওরাই শুধু পরিশ্রম করে। ওদেরই পরিশ্রমের অন্নে বসে বসে খায় লোকটা আর হিরণরা। এসব নিয়েই শ্বশুরমশায়ের মৃত্যুর পর প্রায় রোজই ঝামেলা হত তিন ভাইয়ের। দুই ভাই একদিকে আর একদিকে মানুষটা। কিন্তু সেদিনের মতো এত বড়ো ঝামেলা আগে আর হয়নি।
লোকজন বলছে সারা ভারতবর্ষে কংগ্রেস ভালো করলেও বাংলাতে জিতে যাবে মুসলিম লিগ। বাংলাতে মুসলিমরাই তো সংখ্যাগুরু। তারা ভোট দেবে জিন্নার মুসলিম লিগকে। তাই চাকরি করলে কলকাতায় করাই ভালো। এখনই অনেকে এই দেশ ছেড়ে ওই পারে চলে যাচ্ছে। দেশ ভাগ হলে হিন্দুরা আর কেউই এখানে থাকবে না
মানুষটা ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার পর জীবন দুর্বিষহ হয়ে গেছে হিরণের। উঠতে বসতে খোঁটা শোনে সে। দুই দেওরের খোঁটা। জায়ের খোঁটা। এই ক-মাসের অভিজ্ঞতা থেকে এখন হিরণের মনে হয়, মানুষের সবচেয়ে বড়ো অস্ত্র হল জিভ। কথা দিয়েই কেবল একজন মানুষকে মেরে ফেলা সম্ভব। এইসব এমনিতে বেঁচে আছে কিন্তু আসলে মরে গেছে মানুষজনকে দেখে সব সময় বোঝাও যায় না যে, তারা মরে গেছে। হৃৎপিণ্ড ধুকপুক করে চলে এদের। কিন্তু মন মরে যায়। হৃৎপিণ্ড একটা যন্ত্র, কিন্তু মন তো আর যন্ত্র নয়। লালন সাঁইয়ের গান আছে না ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি ক্যামনে আসে যায়’? মন হল সেই পাখি। তার দানাপানি চাই। খাবারদাবার চাই। মনের খাবার দাবার হল আদরযত্ন। মায়ামাখা কথা। খোঁটা হল বিষ। এই বিষ মনপাখিকে মেরে ফেলে। মানুষটা ঘর ছাড়ার পরে হিরণের মনপাখিও মরে যেত যদি না ছিদাম থাকত।
ছিদাম মানুষটাকে বলত ‘গুরু’। মানুষটার হাত ধরেই ছিদাম এ ঘরে ঢোকে। ছিদাম পরোপকারী। কংগ্রেস করে। দেশ-বিদেশের নানা রকমের খবর শোনায় হিরণকে। ছিদাম বলেছে যে, গান্ধীজি চেষ্টা করছেন বটে, কিন্তু দেশভাগ আর আটকানো মনে হয় যাবে না। তাই চাকরি করতে গেলে কলকাতায় চাকরি করাই ভালো। দেশ ভাগ হলে ওদের জেলা ফরিদপুর, এই মাদারিপুর সাব-ডিভিশন সব পাকিস্তানে চলে যাবে। কিছুদিনের মধ্যেই নির্বাচন হবে। লোকজন বলছে সারা ভারতবর্ষে কংগ্রেস ভালো করলেও বাংলাতে জিতে যাবে মুসলিম লিগ। বাংলাতে মুসলিমরাই তো সংখ্যাগুরু। তারা ভোট দেবে জিন্নার মুসলিম লিগকে। তাই চাকরি করলে কলকাতায় করাই ভালো। এখনই অনেকে এই দেশ ছেড়ে ওই পারে চলে যাচ্ছে। দেশ ভাগ হলে হিন্দুরা আর কেউই এখানে থাকবে না।
ছিদামের এ ঘরে আসা প্রকাশ এবং আকাশ একদম পছন্দ করে না। কিন্তু ওকে আটকাতেও পারে না ওরা। গঞ্জের মুরুব্বিরা সকলেই ছিদামকে চেনে, ভালোওবাসে। প্রকাশ-আকাশ তাই ওকে একটু সমঝে চলে। ছিদাম একবার হিরণকে বলেওছিল ফরিদপুরের কংগ্রেস সভাপতিকে ওর সঙ্গে যে-ব্যবহার করছে ওর দেওররা সে কথা জানাবে কি না। জানালে প্রতিকার হতে পারে। হিরণই নিষেধ করেছে ছিদামকে। সালিশি বসিয়ে প্রতিকার আর ক-দিন হতে পারে ? ছেলেমেয়েগুলোকে নিয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচতে গেলে ওর একটা চাকরি চাই। এই সার সত্যটুকু জীবন ওকে ইতিমধ্যেই বুঝিয়ে দিয়েছে।
♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦
ক্রমশ..
আগের পর্ব পড়ুন: হিরণবালা । পর্ব এক
❤ Support Us








